স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটিয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান। তবে আন্দোলনে নামা পাহাড়ি, সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া মানুষেরা যে অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও সবাইকে নিয়ে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল–তা আজও পূরণ হয়নি।
আন্দোলনের সময় নানা ধর্মের, নানা জাতের, বিভিন্ন পেশা ও রাজনৈতিক মতের মানুষ একসঙ্গে রাজপথে নেমেছিল। কিন্তু আন্দোলনকারীরা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনীতি বা সরকারি ব্যবস্থার মধ্যে সেই ঐক্যের কোনো ছাপ দেখা যাচ্ছে না।
সাম্প্রদায়িক হামলা, পার্বত্য চট্টগ্রামে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা বৈষম্য, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা এবং ক্ষমতার রাজনীতির দাপট দেখে গণআন্দোলন তার মূল পথ থেকে সরে গেল কি না সেই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
তবে এত কিছুর পরও, আগের সরকারের পতন এবং দেশে আবার গণতন্ত্রচর্চার সুযোগ তৈরি হওয়াকে অনেকেই বড় একটি সাফল্য বলে মনে করেন। তাদের মতে, জুলাই আন্দোলন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি, তবে যে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর কথা বলা হয়েছিল, তা এখনো তৈরি হতে বাকি।
‘শুধু নামটাই বদলেছে’
জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া পাহাড়ি তরুণ বর্তমানে চাকরিজীবী রাজু মারমা বলেন, আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচার সরানো, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা এবং বহু বছরের নির্যাতন বন্ধ করা।
তিনি জানান, সেই লক্ষ্য পূরণ হলেও একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে বড় স্বপ্ন সবার ছিল, তা এখনও পূরণ হয়নি।
রাজু বলেন, ‘সবকিছু আগের মতোই চলছে, শুধু নামটাই পাল্টেছে।’
একজন পাহাড়ি নাগরিক হিসেবে তিনি আশা করেছিলেন, জুলাই-পরবর্তী সরকার পাহাড়ের সাম্প্রতিক গোলমাল, বৈষম্য আর নিরাপত্তাহীনতার সমস্যাগুলো সমাধানে নজর দেবে। কিন্তু বাস্তবে কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি।
রাজুর স্বপ্ন ছিল এমন এক বাংলাদেশের–যেখানে ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ থাকবে না এবং পাহাড় ও সমতলের মানুষ সমান শিক্ষা, চাকরি, উন্নয়ন ও সরকারি সুবিধা পাবে।
রাজনীতি করার লোভ হয়তো অনেককে জুলাইয়ের মূল ভাবনা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, তবে রাজু মনে করেন আন্দোলনটি একেবারেই বৃথা যায়নি।
‘রাজনৈতিক স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হয়েছে’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ও জুলাই আন্দোলনের কর্মী অং মু ক্যাও মারমা বলেন, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ছোট উদ্যোগ হিসেবে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে এর ধরন ও উদ্দেশ্য বদলে যায়।
তিনি বলেন, দেশকে নতুন করে গড়া এবং বৈষম্য দূর করার কথা বলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নামানো হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে।
অং মু ক্যাওর মতে, আন্দোলনটি এখন অনেকটাই রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে এবং এর আসল চেতনা হারিয়ে গেছে।
আন্দোলনের পর একটি ছোট দল সব সুযোগ-সুবিধা ও লাভ লুটে নিয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ ও আহতদের অনেকে কোনো স্বীকৃতি পায়নি, এমনকি তাদের খোঁজও নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে যেকোনো আন্দোলনে ক্ষমতার রদবদল হয় ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের আসল দাবিগুলো অধরাই থেকে যায়।’
অং মু আরও জানান, আগের সরকারের সঙ্গে যুক্ত কিছু লোক দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, আর অনেকে পরিচয় লুকিয়ে নতুন নতুন রাজনৈতিক দলে মিশে গেছে।
এসব চোখের সামনে দেখেও অনেকে এখন ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না, যা তাদের মনে এক গভীর অসহায়ত্ব তৈরি করেছে।
অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তির পরীক্ষা নিচ্ছে সাম্প্রতিক সহিংসতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ববি বিশ্বাস জানান, জুলাই আন্দোলন থেকে তার সবচেয়ে বড় চাওয়া ছিল সবার জন্য সমান সুযোগ, ন্যায়বিচার ও সমান নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
আন্দোলনের দিনগুলোতে তিনি সব ধর্মের, সব শ্রেণির মানুষকে একসঙ্গে লড়তে দেখে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
কিন্তু আন্দোলন শেষের পরপরই বিভিন্ন উপাসনালয়ে হামলা, ধর্মের অবমাননার অজুহাতে মারামারি এবং মানুষকে মেরে ফেলার ঘটনা তার সেই স্বপ্নে আঘাত হেনেছে।
ববি বলেন, এসব ঘটনা প্রমাণ করে জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থা নাগরিকদের রক্ষা করতে ও সমান অধিকার বজায় রাখতে পারছে না।
একটি গণঅভ্যুত্থান হয়তো সরকার বদলে দিতে পারে, কিন্তু নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া, অধিকার রক্ষা করা এবং কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হয়। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও গঠনমূলক ভূমিকা রাখা উচিত। অথচ দেশে নতুন নতুন চেহারায় ধ্বংসাত্মক কাজ ও সহিংসতা থেকেই যাচ্ছে।
‘মৌলবাদী শক্তির মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা জুলাইকে পথভ্রষ্ট করেছে’
গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী মনে করেন, জুলাই আন্দোলন তার মূল লক্ষ্য ও সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে।
তিনি বলেন, মৌলবাদী দলগুলোর বেড়ে ওঠা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা এবং প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আক্রমণ সাধারণ মানুষের মনে ভয় ও সংশয় তৈরি করেছে।
ছায়ানট বা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের মতো জায়গায় হামলা কোনোভাবেই জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী বা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, জুলাইয়ের আসল উদ্দেশ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি মানুষের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করাই এখন মূল কাজ হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান সুব্রত চৌধুরী।
নিরাপত্তা কিছুটা ফিরলেও উদ্বেগ কাটেনি
অপর্ণা রায় চৌধুরী বলেন, এই অভ্যুত্থান মানুষকে ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ বানানোর একটি সুযোগ করে দিয়েছে। তবে বহু বছরের রাজনৈতিক ও সরকারি বিষাদ কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে।
তিনি বলেন, হিন্দুসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন, বৈষম্য ও বঞ্চিত হয়ে আসছে।
জুলাই আন্দোলনে তাদের বিপুল অংশগ্রহণই প্রমাণ করে তারা দেশকে কতটা ভালোবাসেন এবং গণতন্ত্রের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল।
তিনি বলেন, যদিও আগের চেয়ে ভয় কিছুটা কমেছে, তাও মাঝে মাঝে ভয়ভীতি দেখানো বা টুকটাক সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে শিক্ষার্থী নেতাদের বর্তমান ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অপর্ণা রায় চৌধুরী।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বা ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যেসব শিক্ষার্থী লড়েছিলেন, তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের ভালো করা, ক্ষমতার লোভ নয়। কিন্তু এখনকার কয়েকজন ছাত্র নেতাকে দেখলে মনে হয় তাদের আসল নজর রাজনৈতিক দল খোলা, বড় বড় পদ দখল করা আর ক্ষমতা দেখানো।
মূল কাঠামো বদলানোর দাবি
আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রান্তিক মানুষগুলোর কথা থেকে একটি সাধারণ কষ্টের ছবিই ফুটে ওঠে–সরকার বদলালেও বৈষম্য, দাঙ্গা ও দুর্বল প্রশাসনকে টিকিয়ে রাখা মূল কাঠামোটি আগের মতোই রয়ে গেছে।
তারা স্পষ্ট বলছেন, পাহাড়ি মানুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে পড়া দলগুলোর নিরাপত্তা, সম্মান ও অধিকার না দিলে জুলাইয়ের ‘বৈষম্যবিরোধী’ কথাটি ফাঁকা বুলি হয়েই থেকে যাবে।
তাদের কাছে জুলাই আন্দোলনের গল্পটি একই সাথে এক বড় অর্জন এবং কিছু অসম্পূর্ণ স্বপ্নের গল্প।
স্বৈরাচারের পতনে একটা আশার আলো দেখা দিয়েছিল ঠিকই, তবে সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সরকারের জবাবদিহিতা, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং পাহাড় ও সমতলের সব মানুষের সমান অধিকার।


