যুক্তরাষ্ট্রের ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চীন হস্তক্ষেপ করেছিল বলে দাবি করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই নির্বাচনেই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের কাছে হেরে গিয়েছিলেন তিনি। অবশ্য ওয়াশিংটনের গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে বেইজিংয়ের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার এমন কিছু গোপন নথি ফাঁস করেছেন, যেগুলোকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে চীনের হস্তক্ষেপের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে ২০২০ সালের নির্বাচন পরিবর্তী সময়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ওই বছরের নির্বাচনের ফলাফলে শি জিনপিংয়ের প্রশাসন প্রভাব ফেলেছে- এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার গত মাসে প্রস্তুত করা একটি নথি ট্রাম্প প্রকাশ করলেও দেখা যায় সেটি যুক্তরাষ্ট্রের নয় বরং ভেনেজুয়েলার নির্বাচন নিয়ে ছিল।
আরেকটি নথিতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের মূল্যায়ন হলো, নির্বাচনের ফলাফল ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো বড় পরিসরে ভোট গণনা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।’ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি তৃতীয় একটি নথিতে বাইডেনের নির্বাচনী প্রচার লক্ষ্য করে চীনা গুপ্তচরদের তৎপরতার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। ওই নথিতে পরিষ্কার বলা হয়েছে, বেইজিং বর্তমানে ওয়াশিংটনের নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার জন্য গোপনে হস্তক্ষেপ করতে চায় না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বৃহস্পতিবার প্রায় ২৫ মিনিটের সরাসরি সম্প্রচারিত ট্রাম্পের ভাষণটি ছিল আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারের অংশ। তিনি দেশের নির্বাচনী নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করার চেষ্টা করছেন। কারণ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধপরিস্থিতি ও জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দামের চাপে জনসমর্থন কমে যাওয়ায় আসন্ন নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা তার দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য বেশ কঠিন হবে।
ট্রাম্প তার ভাষণে আবারও কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যদের নতুন ভোটার পরিচয় ও নাগরিকত্বের শর্ত আরোপকারী আইন পাসের আহ্বান জানান। যদিও দীর্ঘদিনের বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির ঘটনা বিরল।
অসংখ্য মার্কিন আদালতের রায় ও ভোট পুনর্গণনায় ২০২০ সালের নির্বাচনে বড় ধরনের জালিয়াতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কাজেই ডেমোক্র্যাটদের তীব্র বিরোধিতার কারণে প্রস্তাবিত আইনটি তাই সিনেটে আটকে আছে।
ট্রাম্প বলেন, গোপনীয়তামুক্ত নথিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী অবকাঠামোর ‘ভয়াবহ দুর্বলতা’ প্রকাশ করবে। তবে নথিগুলোর অনেকটিতেই এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে অথবা সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিতই ছিল না।
বৃহস্পতিবার ভাষণের শুরুতে ট্রাম্প সংক্ষিপ্তভাবে ইরান যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র “বড় ধরনের জয়” পাচ্ছে।’ এরপর কর কমানো ও অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযানের মতো কয়েকটি অভ্যন্তরীণ সাফল্যের কথা তুলে ধরে তিনি নির্বাচনী নিরাপত্তার প্রসঙ্গে যান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি এমন সংবেদনশীল তথ্য গোপনীয়তামুক্ত করছেন, যাতে দেখা যায় চীন অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ২২ কোটি ভোটারের নথি সংগ্রহ করেছে। এসব নথির মধ্যে নাম, ঠিকানা ও ভোটারের ব্যক্তিগত অন্য তথ্যও রয়েছে।
ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন গোয়েন্দারা চীনের কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি সম্পর্কে তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করেছিলেন।
২০২১ সালে প্রকাশিত মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটার নিবন্ধন, ব্যালট, ভোট গণনা বা ফলাফলসহ নির্বাচনের কোনো প্রযুক্তিগত অংশ পরিবর্তনের চেষ্টা বা সফলতার পেছনে কোনো বিদেশি পক্ষের হাত ছিল- এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
ওই মূল্যায়ন জন র্যাটক্লিফের তত্ত্বাবধানে করা হয়েছিল। সে সময় তিনি ট্রাম্পেরই জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক ছিলেন এবং বর্তমানে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, ২০০৮ সাল কিংবা তারও আগে থেকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটার, জনমত, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। নির্বাচনের ফলাফল আগাম অনুমান করাই সম্ভবত এর লক্ষ্য ছিল।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন, চীন যে মার্কিন ভোটার তথ্য সংগ্রহ করেছিল, সেগুলো গোপনীয় ছিল না। বরং বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইটে থাকা তথ্যই তারা জড়ো করছিলেন। রাজনৈতিক পরামর্শকেরা নিয়মিত ভোটার তালিকা কিনে থাকেন এবং এসব তথ্য পরিবর্তন বা কারসাজি করা সম্ভব ছিল না।
এদিকে ট্রাম্পের ভাষণের আগে হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তা উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, চীনসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হলে তা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। চীনে তার উষ্ণ সফরের পর এমন কঠোর বক্তব্য বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সম্পর্ককে ফের টানাপড়েনে ফেলতে পারে।
গত জুনে চীনের সঙ্গে অস্থিতিশীল সম্পর্ককে স্থিতিশীল করতে বেইজিং সফর করেন ট্রাম্প। দুই পক্ষের বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে আলোচনা করতে সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আরেকটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আশা করছেন তিনি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে ভাষণের আগে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ চ্যাং বলেন, ‘চীন কখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।’
ট্রাম্প বহু বছর ধরে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সন্দেহ উসকে দিয়ে আসছেন। তিনি মনে করেন, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের কাছে তার ২০২০ সালের পরাজয়ের পেছনে কারচুপি ছিল। তবে তার দাবিগুলো বেশিরভাগ সময়ই মিথ্যা বা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
তার দাবি করা আরও কিছু ‘ভুল’ দাবির মধ্যে রয়েছে- ডাকযোগে ভোটে ব্যাপক জালিয়াতি হয়, ভোটযন্ত্র বিশ্বাসযোগ্য নয়, মার্কিন নাগরিক নন এমন মানুষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল পাল্টে দিতে ভোট দিয়ে থাকেন।
এসব দাবি ভুল প্রমাণিত হলেও তা ট্রাম্পের সমর্থকদের ওপর প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। গত এপ্রিল মাসে রয়টার্স ও ইপসসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ রিপাবলিকান বিশ্বাস করেন- ২০২০ সালের নির্বাচন ট্রাম্পের কাছ থেকে চুরি করা হয়েছিল। এ দাবির পক্ষে প্রমাণের অভাব থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনে তেমন একটা পরিবর্তন দেখা যায়নি।
ট্রাম্প বৃহস্পতিবার আরও দাবি করেন, তার প্রশাসন কেবল চারটি অঙ্গরাজ্যে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত দুই লাখ ৭৫ হাজারের বেশি অনাগরিকের তথ্য পেয়েছে। তবে তাদের মধ্যে কতজন প্রকৃতপক্ষে ভোট দিয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়।
এর আগে কয়েকটি ঘটনায় নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য তৈরি ব্যবস্থায় ভুল করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়া কিছু মানুষকে অনাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, অনাগরিকদের প্রকৃতপক্ষে ভোট দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল।
মার্কিন সিনেটের ও গোয়েন্দাবিষয়ক কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মার্ক ওয়ার্নার ট্রাম্পের ভাষণ চলাকালে এক বিবৃতিতে বলেন, ‘চীন নিয়ে ট্রাম্পের চমকপ্রদ তথাকথিত বিস্ফোরক তথ্য পুরোপুরি ভিত্তিহীন। বাস্তবতা হলো, আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সর্বসম্মতভাবে বলেছে, চীন ২০২০ সালের নির্বাচনে একটি ভোটও পরিবর্তনের চেষ্টা করেনি।’
ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনব্যবস্থাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরলেও ২০২০ সালে কোনো ভোট পরিবর্তন বা কারসাজি করা হয়েছিল- এমন কোনো প্রমাণ দেননি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি প্রধান টেলিভিশন নেটওয়ার্কের মধ্যে দুটি এবং সিএনএন তাদের মূল সম্প্রচারমাধ্যমে ট্রাম্পের ভাষণটি প্রচার করেনি। সাধারণত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বড় ধরনের ভাষণের ক্ষেত্রেই সরাসরি সম্প্রচারের এ ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়।
ট্রাম্প তার ভাষণে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের ‘আমেরিকা রক্ষা আইন’ এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
প্রস্তাবিত এ আইনে ভোট দেওয়ার জন্য ছবিসংবলিত পরিচয়পত্র এবং ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট ও ভোটাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, বৈধ ভোট দমন করাই এ আইনের উদ্দেশ্য।
রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিলটি কয়েকবার পাস হয়েছে। তবে রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের বাধা অতিক্রম করতে প্রয়োজনীয় ৬০টি ভোট এর পক্ষে নেই।
কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পকে ২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে কথা না বলে বর্তমানে জাতীয় সংকট হিসেবে প্রকাশ পাওয়া উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়সহ সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।


