জমজমের পানি: খাঁটি কি না সন্দেহ, তবু জমজমাট ব্যবসা

জমজমের পানি: খাঁটি কি না সন্দেহ, তবু জমজমাট ব্যবসা
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ৩ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে মক্কার পবিত্র জমজমের পাঁচ লিটার পানি। অথচ এই পানি সত্যি সত্যি জমজম কূপের কি না, তার কোনো সঠিক প্রমাণ দিতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা।

খোলা বাজারে জমজমের পানি বিক্রি করা নিষেধ। তা সত্ত্বেও অনলাইন ও দোকানগুলোতে পুরোদমে চলছে এর বেচাকেনা। এমনকি অনেক ব্যবসায়ী নিজেই অভিযোগ করছেন, কিছু অসাধু বিক্রেতা বেশি লাভের আশায় আসল জমজমের পানির সঙ্গে সাধারণ পানি মিশিয়ে বিক্রি করছে।

বিক্রেতাদের কেউ বলছেন তারা হজযাত্রীদের কাছ থেকে এই পানি কেনেন, আবার কেউ বলছেন বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে আনেন। তবে পানি কোথা থেকে এলো, কীভাবে রাখা হলো কিংবা বোতলের পানি আসলেও খাঁটি কি না—তার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ কেউ দিতে পারেননি।

এমনকি কিছু দোকানদার স্বীকারই করেছেন, মানুষের বিশ্বাসের ওপর ভর করেই তারা এই পানির ব্যবসা করেন।

সৌদি আরবের পবিত্র কাবা শরিফের কাছেই অবস্থিত ঐতিহাসিক জমজম কূপ। হজ ও ওমরাহ করতে যাওয়া মুসলমানদের কাছে এই পানির ধর্মীয় গুরুত্ব অপরিসীম। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীরা এই পানি পান করেন, ওজু ও গোসলে ব্যবহার করেন এবং দেশে ফেরার সময় পরিবারের জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে যান।

সৌদি আরবে জমজমের পানির ৫ লিটারের একটি সিলগালা বোতলের দাম ১০ রিয়াল, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৮২ টাকা। আর ছোট বোতল বা খোলা পানি সেখানে একেবারেই বিনামূল্যে পাওয়া যায়।

কিন্তু সেই পানি ঢাকায় এলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। আড়াইশ মিলিলিটারের ছোট বোতল বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়, আর ৫ লিটারের বোতলের দাম হাঁকা হয় ২৫০০ থেকে ৩৬০০ টাকা।

রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকার ইসলামিক পণ্যের দোকান ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।

তবে কীভাবে এই পানি আনা হয়, সারা বছর জোগান কীভাবে থাকে, কিনতে কত খরচ হয় কিংবা সাধারণ পানি মেশানো হয় কি না—এসব প্রশ্নে মুখে কুলুপ এঁটেছেন ব্যবসায়ীরা।

বায়তুল মোকাররমের নিচতলার কয়েকজন দোকানদার জানান, জমজমের পানির চাহিদা খুব বেশি, কিন্তু সে তুলনায় সরবরাহ কম।

তারা জানান, হজযাত্রীদের কিছু টাকা ‘সম্মানী’ দিয়ে বা বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে তারা পানি আনেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান, এই এলাকায় প্রায় ২৫০টি দোকানে জমজমের পানি বিক্রি হয়। তবে কেউই নিয়মিত সরবরাহ ধরে রাখতে পারে না।

আরও পড়ুন

পানি কেনার আসল খরচ বা এটি আনার উপায় নিয়ে ব্যবসায়ীরা স্পষ্ট কিছু বলতে চাননি। উল্টো কিছু ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, বিক্রির আগে এতে সাধারণ পানি মেশানো হয়।

শাহীন মিয়া নামের এক ব্যবসায়ী টাইমসকে বলেন, ‘কিছু অসাধু লোক এই কাজ করছে। তবে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে সামান্য জ্ঞান থাকলেও কারও এমন কাজ করা উচিত নয়।’

বায়তুল মোকাররমের আরেক ব্যবসায়ী শুক্কুর আলী বলেন, ‘কিছু দোকানদার বছরে মাত্র একটি ৫ লিটারের বোতল আনেন। তারপর সারা বছর সেটিতে সাধারণ পানি মিশিয়ে বিক্রি করতেই থাকেন। ক্রেতাদের বিশ্বাস করাতে খাঁটি বোতলটি দোকানে সাজিয়ে রাখেন।’ এই প্রতারণা নিয়ে কয়েকবার ক্রেতা-বিক্রেতার ঝগড়াঝাঁটিও হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে কোনটি আসল আর কোনটি ভেজাল তা বোঝার কোনো উপায় নেই।’

জমজম বলে বিক্রি হওয়া পানির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় এদিকে কয়েক বছর আগেই নজর দেয় সরকার। ২০২৩ সালে বায়তুল মোকাররম মার্কেটে অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। তখন ২৫০ মিলিলিটারের বোতল ৩০০-৩৫০ টাকা এবং ৫ লিটারের বোতল ২৫০০ টাকারও বেশি দামে বিক্রি হতে দেখা যায়।

বায়তুল মোকাররম মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক খান দোলন তখন জানান, তিনি বিষয়টি জানতেন না। কোনো হজযাত্রী আদৌ জমজমের পানি বিক্রি করবেন কি না—তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আইন ভাঙলে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এরপর ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি খোলা বাজারে জমজমের পানি বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর। নিয়ম না মানলে দোকান সিলগালা করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। পাশাপাশি ফেসবুকে পানি বিক্রিকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থার কথা বলা হয়।

সংস্থাটি জানিয়েছিল, ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা করা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। সৌদি সরকার বাণিজ্যিকভাবে জমজমের পানি বিক্রি করে না—এমন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ইসলামি চিন্তাবিদদের সঙ্গে পরামর্শ করেই এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

কিন্তু নির্দেশনার পরও এই বাণিজ্য থামেনি। বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি কিছুটা কমলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপনের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।

ফেসবুকের অনেক পেজে নির্দিষ্ট দামে ‘আসল জমজমের পানি’ বিক্রির পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। আবার কেউ ৯৯০ টাকার রুকাইয়া পেপার ও আজওয়া খেজুরের প্যাকেজের সঙ্গে ‘জমজমের পানি’ ফ্রি দেওয়ার অফার দিচ্ছে। ঘরে বসে ডেলিভারি পাওয়ার সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে।

‘তাহারাৎ জোন’ ও ‘মানার’-এর মতো একাধিক ফেসবুক পেজে সরাসরি জমজমের পানি বিক্রি হচ্ছে। তবে অনলাইনে বিক্রি হওয়া পানির উৎস বা সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

‘বিক্রি বৈধ’, তবে কিছু শর্ত আছে ইসলামি বিধান অনুযায়ী, জমজমের পানি একবার সংগ্রহ করে নিজের মালিকানায় নেওয়ার পর তা বিক্রি করায় কোনো বাধা নেই।

সৌদি আরবের প্রখ্যাত আলেমদের বরাত দিয়ে ‘ইসলামকিউএ’-তে বলা হয়েছে, পাত্রে জমজমের পানি ভরে তা বিক্রি করা এবং অন্য দেশে নিয়ে যাওয়া জায়েজ।

হানাফি মাযহাবের আলেমদের মতেও, বোতলজাত জমজমের পানি যিনি সংগ্রহ করেন তিনি সেটির মালিক হন। তাই তা কেনাবেচা করা বৈধ। পাশাপাশি আফ্রিকার ‘দারুল ইফতা মাহমুদিয়্যাহ’-এর ফতোয়াতেও বলা হয়েছে, এই পানি বিক্রি করে লাভ করা শরিয়তসম্মত।

বাংলাদেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল্লাহও জানান, কিছু শর্ত মেনে এই পানি বিক্রি করা জায়েজ।

তিনি টাইমসকে বলেন, ‘সীমিত পরিসরে পানি এনে বোতলজাত করা ও যাতায়াত খরচের ওপর ভিত্তি করে দাম ধরে বিক্রি করা যেতে পারে।’

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিক্রেতাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন পানির উৎস বৈধ হয়, পানি সত্যি জমজমের হয় এবং কোনো ধরনের প্রতারণা বা ধোঁকাবাজির আশ্রয় না নেওয়া হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad