গণপূর্তে একদিনে ২৭ টেন্ডারের চুক্তি, পরদিনই বিল দেওয়ার অভিযোগ

গণপূর্তে একদিনে ২৭ টেন্ডারের চুক্তি, পরদিনই বিল দেওয়ার অভিযোগ
নির্বাহী প্রকৌশলী মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (বায়ে)। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

কিশোরগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ঘুষ-বাণিজ্য, স্বেচ্ছাচারিতা ও সরকারি অর্থ আত্মসাতসহ অন্তত ১০ ধরনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জেলার ১৪ জন ঠিকাদার।

গত ২১ সেপ্টেম্বর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে ১৪ জন ঠিকাদারের সই করা লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। একই ধরনের অভিযোগ দেওয়া হয়েছে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছেও।

এতে বলা হয়, প্রায় তিন বছর ধরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা অবৈধ কাজে জড়িত ছিলেন।

এক দিনে ২৭ টেন্ডারের চুক্তি, পরদিন বিল

ঠিকাদারদের অভিযোগ, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এলটিএম (লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড) পদ্ধতিতে কাজ দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও নির্বাহী প্রকৌশলী অন্তত ৩৫টি কাজ ওটিএম (ওপেন টেন্ডারিং মেথড) পদ্ধতিতে করেছেন। যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ এলটিএমে করার কথা, সেখানে অধিকাংশ কাজই ওটিএমে করা হচ্ছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এসব টেন্ডারের বিজ্ঞপ্তি পত্রিকায় প্রকাশ না করে পছন্দের কয়েকজন ঠিকাদারের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এলটিএমে যেখানে ৬০ থেকে ৭০ জন ঠিকাদার অংশ নেন, সেখানে ওটিএমে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা পাঁচ থেকে সাত জনে নেমে আসে।

ঠিকাদারদের অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর একটি ঘটনা কিশোরগঞ্জ মডেল মসজিদের ২৭টি কাজ নিয়ে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২১ জুন এসব কাজের জন্য ওটিএম টেন্ডার আহ্বান করা হয়। পরদিন ২২ জুনই চুক্তিপত্র সম্পন্ন করা হয়। এর পরদিন ২৩ জুন কাজের বিলের চেক দেওয়া হয়। ২৭টি কাজই পাঁচজন পছন্দের ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এভাবে টেন্ডার প্রক্রিয়া সীমিত করে দেওয়ায় প্রতিযোগিতা কমেছে এবং সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

আগের অর্থবছরেও একই অভিযোগ

২০২৫-২৬ অর্থবছরেও পিপিআর অনুসরণ না করে এলটিএমের পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে কাজ ভাগ করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ঠিকাদারেরা। তাদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলীর পছন্দের ঢাকা ও কিশোরগঞ্জের কয়েকজন ঠিকাদারকে এসব কাজ দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

এ ছাড়া ওই অর্থবছরে এপিপিভুক্ত কাজের বিল পরিশোধ না করে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনেরও অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, এসব অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী তার নিজ জেলা নাটোরে দুটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন।

সরকারি বাসা সংস্কারে অনিয়ম

কিশোরগঞ্জে যোগ দেওয়ার পর সরকারি বাসা সংস্কারের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন ঠিকাদারেরা।

তাদের দাবি, ঠিকাদারদের কাছ থেকে পাঁচ শতাংশ করে ‘সিকিউরিটি’ নেওয়া হয়েছে এবং এভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

চলতি বছর ঈদুল আজহার আগে ঢাকার এক পরিচিত ঠিকাদারের নামে নয়টি চেকের মাধ্যমে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।

মডেল মসজিদ, মিঠামইন শিল্পকলা একাডেমি, আইনজীবী ভবন ও বিভিন্ন থানা ভবনের কাজ পাইয়ে দেওয়া, অগ্রিম বিল পরিশোধ এবং মিঠামইন শিল্পকলার বাউন্ডারি ওয়াল ও পাইলিংয়ের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

অফিসে অনুপস্থিতি ও সরকারি গাড়ি ব্যবহার

অভিযোগকারীদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিনের বেশি অফিস করেন না। তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে প্রায়ই ‘ঢাকায় মিটিংয়ে আছেন’ বলে জানানো হয়।

সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে ঢাকা ও নাটোরে যাতায়াত করেন।

২০২৫ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে বিদেশ ভ্রমণের জন্য ছুটি অনুমোদন না পেলেও তিনি ঢাকায় অবস্থান করেন এবং সেখানে তার ব্যক্তিগত ১০ তলা ভবন নির্মাণের কাজে সময় দেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

কোয়ার্টার সংস্কার না করায় দখলের শঙ্কা

সরকারি সম্পদ রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগও রয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কিশোরগঞ্জের পাট গবেষণা এলাকায় গণপূর্ত বিভাগের কোয়ার্টারে ছয়টি পরিবার বসবাস করত। বসবাসের উপযোগী রাখতে কোয়ার্টারটি সংস্কার করা প্রয়োজন হলেও তা করা হয়নি। ফলে কর্মচারীরা অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এতে কোয়ার্টারটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে এবং জায়গাটি বেদখল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন ঠিকাদারেরা।

‘অভিযোগগুলো মনগড়া ও ভিত্তিহীন দাবি নির্বাহী প্রকৌশলীর’

এদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কিশোরগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। তার দাবি, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। ঠিকাদারদের মধ্যে দু-একজন তাদের স্বার্থ হাসিলে ব্যর্থ হয়ে দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে আসছেন।’ অভিযোগগুলোর বিষয়ে অধিদপ্তর থেকে আগেও তদন্ত হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘তদন্তে এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।’

ঠিকাদারদের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad