যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (৮৬) নিহত হয়েছেন। ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম শনিবার রাতে খামেনির মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ঘোষণা দেন, খামেনি যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন।
সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই ইরান জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। এমন এক সময়ে তাকে হত্যা করা হলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বিরাজ করছে। আঞ্চলিক যুদ্ধ সংকটে খামেনি ছিলেন মুসলমানদের এক শক্তিশালী স্তম্ভ। সেই শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব ধারণকারী নেতার জীবনের সারসংক্ষেপ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
প্রারম্ভিক জীবন ও ধর্মীয় শিক্ষা
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৩৯ সালে ইরানের মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তখন মাশহাদ ছিল বিপ্লবী আন্দোলনের কেন্দ্র। আয়াতুল্লাহ আলীর বাবা হোসেন আলী খামেনি ছিলেন ধর্মীয় শিক্ষাবিদ ও স্থানীয় খলিফা এবং মা মরিয়ম শাফী’ই ছিলেন গৃহিণী।
ধর্মনির্ভর পরিবারে জন্ম নেওয়া খামেনির ধর্মীয় শিক্ষায় হাতেখড়ি বাবার হাত ধরে। এরপর খ্যাতনামা ধর্মগুরুদের সান্নিধ্যে তিনি ইসলামের সুক্ষ্ম বিষয়গুলো নিয়েও পড়াশোনার সুযোগ পান।

১৯৬০-এর দশকে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা এবং প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনির তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করেন খামেনি। খোমেইনি ছিলেন শিয়া ধর্মের বিশিষ্ট পণ্ডিত ও রাজনৈতিক নেতা। তিনিই ইরানে ধর্মীয় শিক্ষাকে রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে দেন।
খামেনি যখন তেহরানের দক্ষিণে কুম শহরে গুরু খোমেইনির সেমিনারিতে যোগ দেন, তখন খোমেইনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন।
পরে তার হাত ধরেই রাজনৈতিক বিপ্লবে পা রাখেন আয়াতুল্লাহ খামেনি।
বিপ্লবী কর্মকাণ্ড
১৯৭৯ সালে খোমেইনির নেতৃত্বে ইরানের শেষ সম্রাট শাহী মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে উৎখাতের আন্দোলনে অংশ নিয়ে কারাগারে যান খামেনি। সেখান থেকেই তিনি গুপ্তভাবে আন্দোলন চালান। তবে সরকার পতনে সফল হয়ে দেশে ফেরার পর খোমেইনি ইরানকে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করেন এবং শিষ্য খামেনিকে ‘গোপন রেভল্যুশনারি কাউন্সিলে’ অন্তর্ভুক্ত করেন। সে থেকেই তিনি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতায় দক্ষতা অর্জন করেন।
রাজনৈতিক উত্থান
১৯৮১ সালে খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সেই বছর এক জনসভায় বক্তব্য রাখার সময় সামনে থাকা রেডিওতে বিস্ফোরণ হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন খামেনি। তদন্তে জানা যায়, প্রেসিডেন্ট খামেনিকে হত্যার উদ্দেশ্যে রেডিওটিতে বোমা রাখা ছিল। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টায় জীবিত ফিরলেও ওই হামলায় তার একটি হাত পঙ্গু হয়ে যায়।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ক্ষমতায় ওঠা

১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খোমেইনির মৃত্যুর পর খামেনিকে ওই পদে আসীন করা হয়। তিনি ‘হুজতুল ইসলাম’ থেকে গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহর মর্যাদায় উন্নীত হন।
সে সময় আলেমরা ধর্মীয় জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় খামেনির যোগ্যতাকে ‘সীমিত’ উল্লেখ করলেও তিনি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হন।
এরপর তিনি বিশ্বে তুলনামূলক নিগৃহীত শিয়া ধর্মের অনুসারী সম্প্রদায়কে গুরুত্ব দেন এবং সম্প্রসারিত করেন।
ইরানের নিরাপত্তায় এক বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ড প্রতিষ্ঠা করেন খামেনি। ধীরে ধীরে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ইরানের নির্বাচিত সরকারকেও তিনি পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন।
অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ ও দমন
কট্টর ইসলামপন্থী খামেনির শাসনামলেও ইরানজুড়ে বহু বিক্ষোভ ঘটে। ১৯৯৭ সালে কট্টর সংস্কারপন্থীদের (প্রো-রিফর্মিস্ট) বিজয় ও প্রেসিডেন্ট খাতামির নির্বাচনের সময় তিনি কঠোর পদক্ষেপ নেন।
২০০৫ সালে তার সমর্থন পেয়ে মাহমুদ আহমাদিনেজাদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সে সময়ও মধ্যমপন্থীদের মধ্যে তীব্র বিরোধিতা দেখা যায়। ২০০৯ সালের বিতর্কিত পুনঃনির্বাচনের পর ব্যাপক বিক্ষোভ দমনে আয়াতুল্লাহ খামেনির রেভল্যুশনারি গার্ড, বাসিজ মিলিশিয়া ও পুলিশ শত শত মানুষ হত্যা ও আটক করে।
২০২২ সালে হিজাব আইনে মাহাসা আমিনির মৃত্যুর পর বিক্ষোভ দমনেও পাঁচ শতাধিক মানুষ নিহত হন, আটক হন কয়েক লাখ।
তবে সবশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের অর্থনৈতিক বিক্ষোভে কোণঠাঁসা হয়ে পড়েন আয়াতুল্লাহ খামেনি।
ইরানের ইতিহাসের অন্যতম বড় ওই আন্দোলনে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন।
আঞ্চলিক প্রভাব ও প্রক্সি বাহিনী
খামেনি নিজে শিয়া মতবাদের অনুসারী হলেও সুন্নী মতবাদের অনুসারীদের সঙ্গে আন্তরিকতা বজায় রাখেন। তার দেওয়া ফতোয়া মেনেই সুন্নী সম্প্রদায়ের ওপর হামলা কিংবা প্রতিশোধমূলক মনোভাব রাখা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তেহরান।

একই সঙ্গে খামেনি সুন্নী মতবাদের অনুসারী প্রতিবেশী ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী ও লেবাননের হিজবুল্লাহসহ অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেন। এইসব প্রক্সি বাহিনী ব্যবহার করে তিনি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তির বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন।
পারমাণবিক কর্মসূচি
খামেনি ধর্মীয় নেতা হিসেবে খ্যাতি কুড়ালেও বিজ্ঞানের প্রতি তার ছিল প্রবল আকর্ষণ। তিনি মনে করতেন ধর্ম এবং বিজ্ঞান একে অপরের পরিপূরক। আর সে কারণেই তিনি মধ্যপ্রাচ্যে বিজ্ঞান গবেষণাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। স্টেম সেল নিয়ে গবেষণা থেকে শুরু করে মহাকাশ… খামেনির নেতৃত্বে প্রতিটি খাতেই বিচরণ শুরু করে ইরান।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতার গুরত্ব অনুধাবন করে তিনি পারমাণবিক কর্মসূচিও এগিয়ে নেন। যুক্তরাষ্ট্র এতে বিরোধিতা করলে খামেনি বলেন- পারমাণবিক অস্ত্র ইসলামের বিপরীতে। ইসলাম নিরপরাধ জীবন ধ্বংস সমর্থন দেয় না। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করলেও কখনোই শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রোগ্রাম থেকে নিজস্ব অধিকার ত্যাগ করবে না।
২০১৫ সালের চুক্তির শর্ত নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে বের হয়ে গেলে ইরান সীমার বাইরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধি শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, বর্তমানে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সংরক্ষণ করেছে।

খামেনির মৃত্যু
দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়েই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন। সে থেকেই তিনি আয়াতুল্লাহ খামেনি ও ইরান কর্তৃপক্ষকে নতুন পারমাণবিক চুক্তিতে রাজি হওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে রাজি না হলে ইরানে হামলার হুঁশিয়ারিও দেন ট্রাম্প।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানের সরকার দফায় দফায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় পারমাণবিক আলোচনায় বসে। তবুও সেই ফাঁকেই মধ্যপ্রাচ্যে শক্তি বাড়াতে সবচেয়ে বড় দুটি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে পেন্টাগন।
তেহরান এরপরও কোনো সমঝোতায় না পৌঁছানোয় শনিবার ইরানে অতর্কিতে হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে খামেনির বাসভবন, কার্যালয়সহ লক্ষ্যবস্তু করা হয় ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও সরকারি স্থাপনাগুলো।

হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনিই প্রথম ঘোষণা দেন- আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হামলায় মারা গেছেন এবং মার্কিন সেনারা তার মরদেহ দেখিয়েছে।
এরপর রোববার সকালে ইরান কর্তৃপক্ষ আয়তুল্লাহ আলী খামেনি, তার মেয়ে, পুত্রবধূ, জামাতা ও নাতি নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করে।
সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে শোকের মাতম বইছে গোটা ইরানে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সম্মানে সরকার ৪০ দিনের শোক এবং সাতদিনের জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেছে।
ইরানের ভবিষ্যৎ প্রশ্ন
খামেনির মৃত্যুতে ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। আপাতত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, প্রধান বিচারপতি ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হলেও পরবর্তী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা কে হবেন তা অনিশ্চিত।
ইরানের আইন অনুযায়ী, ৮৮ আসনের বিশেষ ক্লেরিকদের সংস্থা নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে। তবে এক্ষেত্রে খামেনির যোগ্য উত্তরাধিকারী কে হতে পারেন তা নিয়ে যথেষ্ট জল্পনা রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যু ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে এক নক্ষত্রের পতন। মধ্যপ্রাচ্যে ইসলাম প্রসারের পাশাপাশি পশ্চিমা শক্তি মোকাবিলায় তার সাহস, জ্ঞান, প্রজ্ঞা পরবর্তী প্রজন্মের পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।


