শরীফুল ইসলাম, বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য। তবে সেই পরিচয় ছাপিয়ে এই বাঁহাতি পেসার এখন বাংলাদেশের পেস আক্রমণের অন্যতম সদস্য। খেলছেন তিন ফরম্যাটেই। এবারের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) নিলামেও তার দাম উঠেছে ৫৮ লাখ টাকা, তাকে দলে টেনেছে চট্টগ্রাম রয়্যালস। যদিও টুর্নামেন্ট শুরুর আগে মূল মালিকপক্ষ সরে যাওয়াতে দলের দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। অবশ্য সেসব ছাপিয়ে জয় দিয়েই বিপিএল শুরু করেছে চট্টগ্রাম।
এর আগে অবশ্য ছুটি কাটিয়ে এসেছেন পঞ্চগড়ে নিজের বাড়িতে। যেখানে প্রায়শই তাকে খেলতে দেখা যায় শর্ট পিচ ক্রিকেট। সেই ছুটিতেই আয়োজন করেছেন শর্ট পিচ নাইট ক্রিকেট টুর্নামেন্টের, খেলেছেন তার জাতীয় দলের সতীর্থ নাহিদ রানাও। অর্থাৎ ছুটিতে গিয়েও ক্রিকেট নিয়েই থাকেন শরীফুল।
সিলেটে সেসব গল্পই চলতি বিপিএলের এক ছুটির দিনের পড়ন্ত বিকেলে টিম হোটেলের ছাদে বসে শরীফুল শোনালেন টাইমস অফ বাংলাদেশ-এর জুবায়ের তানিনকে-
শুরুতেই আপনাকে একটু পেছনে নিয়ে যাই। আপনার ওই নগরডাঙ্গা গ্রামের জীবন থেকে এখানে। কেমন লাগে এখন পেছন ফিরে তাকালে?
অবশ্যই ভালো লাগে। যখন যাই তখন সবাই মিলে অনেক মজা করি। আমাদের গ্রামবাসী, ফ্রেন্ড সার্কেল, মামা, ভাগ্নে, ভাই সবাই মিলে। তো সত্যিকার কথা বলতে ঢাকা যখন যাই তখন এই কয়েকটা দিন খুব ভালো লাগে। মেন্টাল রিফ্রেশমেন্ট বলেন খুব ভালো লাগে।
রাজশাহীর ক্লেমন একাডেমীতে অনুশীলন করতেন, সেখান থেকে কোচ আলমগীর কবিরের নজর কাড়েন। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের মাহবুব আলী জ্যাকির সাথে কাজ করলেন, যিনি ক’দিন আগে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। বলা হয় যে আসলে তিনিই আপনার ক্যারিয়ারটা এবং বোলিং ছাঁচে এনেছেন…
হ্যাঁ অবশ্যই। প্রথমত জ্যাকি স্যারের সাথে আমরা প্রায় তিন বছরের মতো কাজ করেছি এবং আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে সমস্ত সর্বোত্তম স্তর দান করুক। এটিই আমাদের চাওয়া। খুব ভালো মানুষ ছিলেন। শুধু আমি না, আমাদের অনূর্ধ্ব-১৯ ব্যাচের ওরাও না, বাংলাদেশের যত ফাস্ট বোলার আছে, সাবাই উনার হাত দিয়েই এসেছে। সবাই অনেক মিস করবে স্যারকে।
এবার বিপিএলের কথাটা যদি বলি, নিলামে বেশ ভালো দাম উঠেছে আপনার। এরপর ওখান থেকে অনেক অদলবদলের মধ্যে দিয়ে গেল আপনাদের দল। টুর্নামেন্টের আগের দিন মালিকানা বদলাল, বিসিবি দায়িত্ব নিল। এখান থেকে যদি আপনারা প্লেঅফ পর্যন্ত যেতে পারেন সেটা একটা বড় স্টেটমেন্ট হবে কিনা?
অবশ্যই প্রতিটা টিমের প্লেয়ারই চায় যে তারা প্লেঅফে যেতে এবংচ্যাম্পিয়ন হতে। আমরা অতদূর এখনো ভাবছি না। আমরা ভাবছি ম্যাচ বাই ম্যাচের কথা। তো ম্যাচ বাই ম্যাচ ভালো রেজাল্ট করলে আমরা হয়তো প্লেঅফ যেতে পারবো ইনশাআল্লাহ। সো আমাদের টিমের পজিশনটা কিন্তু খুব ভালো। সবাই ফর্মে আছে। কারণ টিম হিসেবে আমাদের আমরা খুব বন্ডিং খুব ভালো। তো এখানে সবাই অভিজ্ঞ। সবকিছু মিলে আমার মনে হয় যে আমরা ভালো ফাইট দিতে পারবো।
আপনি, শেখ মাহেদী আর তানভীর ইসলাম। ন্যাশনাল লেভেলে তিনটা বোলার একসাথে খেলছেন। এটা কতটা শক্তির জায়গা চট্টগ্রামের জন্য?
হ্যাঁ অবশ্যই। এটা খুব ভালো লাগে যে তিনটা ভালো বোলার আমরা এক টিমে । আমাদের সাথে অবশ্য মুগ্ধ আছে, রনি ভাই আছে। সবাই কিন্তু খুব ভালো পারফর্ম করছে। রনি ভাই কিন্তু বিপিএলের প্রতিবারই আলহামদুলিল্লাহ ভালো পারফর্ম করছে। সাথে নাইম শেখ তো আছেই।
আগেরবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইনজুরির জন্য খেলতে পারেননি। আপনার জায়গায় তানজিম সাকিব সুযোগ পেয়ে বেশ ভালো করেছে। এবার নিশ্চয়ই আপনার প্ল্যান থাকবে নিজের সেরাটা দেয়ার?
তা অবশ্যই আছে। প্রথমত আমার চিন্তা হলো বিপিএলটা আমি ঠিক থেকে কীভাবে শেষ করতে পারি। পরবর্তীতে আমি থাকবো কিনা সে তো আমি জানি না। তো আল্লাহর রহমতে যদি সিলেক্টেড হই ইনশাআল্লাহ আমি চেষ্টা করব, আমার সেরাটা দিয়ে খেলা।
প্রথম ম্যাচের কথা যদি বলি, হাবিবুর রহমান সোহান আপনাকে বাউন্ডারি মারছিল। তারপর আপনি করলেন লং অন বের করে দিলেন। রীতিমতো টোপ দিলেন যে আমি তোমাকে ফুল লেন্থে করব। কিন্তু করলেন একটা আউট সুইংগার। এই যে প্ল্যানগুলো করেন, সেসব সফল হলে কেমন লাগে?
একটা বোলার যখন প্ল্যান এক্সিকিউট করতে পারে তার ভিতরে অনেকটা আনন্দ হয়। আমরা নেটে এসব করি। নেটে অনুশীলন করতে করতে এটার একটা অভ্যস্ততা এসে যায়। এরপর ম্যাচে যখন সফলতা পাই, তখন অনেক খুশি লাগে।
নতুন বলে তো বল করছেন, শেষ দিকেও বল করেন। পাওয়ারপ্লে আর ডেথ ওভার; এই দুইটা ধাপে বল করার সময় মাইন্ডসেটটা কেমন থাকে?
মাইন্ডসেট থাকে অলওয়েজ টিম যেটা ডিমান্ড করে। টিম ইয়র্কার চাইলে ইয়র্কার, স্লোয়ার চাইলে স্লোয়ার চেষ্টা করা। হয়তো অনেক সময় সাকসেস হই, অনেক সময় হই না। তো এগুলো নিয়েই প্র্যাকটিস করা, এগুলোর উপরে আরো জোর দেওয়া। এখন দুইটা সেকশনেই বল করতে হবে, দুইটা সেকশনই এনজয় করতে হবে। এবং ক্রিকেট খেলা মানেই এনজয় করে খেলতে হবে।
অ্যালান ডোনাল্ডের সাথে কাজ করেছেন, এখন শন টেইট আছেন আপনাদের সাথে। দুই কোচের মধ্যে পার্থক্য কেমন?
না না, কোনো কোচদের কোনো ডিফারেন্স কিছু থাকে না। সবারই কাজের ধরন একই থাকে।
প্রায়ই ভিডিও দেখি পঞ্চগড়ে বাসার সামনে ক্রিকেট খেলেন। একটা শর্ট পিচ ক্রিকেট টুর্নামেন্টও এরেঞ্জ করলেন কয়েকদিন আগে। নাহিদ রানাকেও দেখলাম আপনার সাথে। ছুটিতে গিয়েও ক্রিকেটের সাথেই থাকেন…
অবশ্যই। অ্যাজ এ প্রোফেশনাল ক্রিকেটার সত্যি কথা বলতে যদি বেঁচে থাকি কখনো যদি অবসরও নেই। এমনিতেও ক্রিকেট ছাড়া থাকাটা খুব কষ্ট হয়ে যাবে। যখনই সুযোগ পাবো খেলব। কারণ এটা রক্তের সাথে মিশে গেছে। তো যখন ক্রিকেট খেলি তখনই একটা হ্যাপিনেস কাজ করে।
আপনি উইকেট নেয়ার বেশ তেড়েফুঁড়ে সেলিব্রেট করেন। পেস বোলার মানেই এই এগ্রেশনটা থাকবে। কিন্তু একটা বাউন্ডারি খেলে ওখান থেকে কামব্যাক করেন কীভাবে? প্রসেসটা কী থাকে?
কোনো ব্যাটার যদি কিছু বল ডট বল খেলে, সে কিন্তু চায় যে একটা বাউন্ডারি মেরে তার প্রেশার রিলিজ করতে। বোলার হিসেবে আমারও একই চিন্তা থাকে। যদি কেউ আমাকে মারে তখন আমি চাই যে কিভাবে ডট দেওয়া যায় বা তাকে আউট করা যায়। কখনো সাকসেস হয়, অনেক সময় হয় না। কিন্তু যখন হয় তখন ভালো লাগা কাজ করে। প্রতিটা বোলারই আমার মনে হয় যে চায় যে ভালো বল করতে, প্রতিটা ব্যাটসম্যানই চায় ভালো খেলতে। তো এই যে একটা ভালো চাওয়া দুইজনের ভিতরে, এর মধ্যেই ফাইট হয়।
আপনি তো পঞ্চগড়ের ছেলে। সেখান থেকে আরেকটা শরীফুল কিভাবে উঠে আসতে পারে? ওখানকার ক্রিকেটের আসল চিত্রটা কেমন?
সত্যি কথা বলতে আমাদের ওখানে এইজ লেভেলটা এখনো অনেক পিছনে পড়ে আছে। ভালো উইকেট নাই। স্টেডিয়াম তো আছে ওখানে, কিন্তু সত্যি বলতে ফুটবল খেলাটাই বেশি হয়, প্রাধান্য দেওয়া হয়। ক্রিকেটটাও অল্পবিস্তর প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু মাঠে বল গড়িয়ে যায় মানে ট্রু উইকেটটা নাই ওখানে। কেউ একজন যে প্র্যাকটিস করবে ভালো ফ্যাসিলিটিসটা নেই। তো তাও ভরসা আশা রাখি, ভরসা আছে যে আমার থেকে আরো ভালো ভালো বোলার ওখান থেকে বের হবে। আপনারা জানেন হয়তো রিজওয়ান চৌধুরী অর্ণব ও কিন্তু আমার আমাদের ওখানে। তো এখন ইনজুরিতে আছে। আমি আশা করবো সে ভালো ভবিষ্যতে ইনশাআল্লাহ ভালো কিছু দিবে বাংলাদেশকে।
শরীফুলের মতো আরেকটা পেসার পঞ্চগড় থেকে উঠে আসার পথটা কি আসলে কঠিন বলা যায়?
অবশ্যই অনেক কঠিন। হয়তো আমাকে আল্লাহ তাআলা যেকোনোভাবে রাস্তা দেখিয়েছেন। আমার কষ্টের কারণে হোক বা আমার কোচদের হেল্পের কারণে হোক, আমি ভালো জায়গায় চলে আসছি আলহামদুলিল্লাহ। বাট এরকম সাহসী সিদ্ধান্ত অনেকে হয়তো নিতে নাও পারে। কারণ যদি ভালো একাডেমী বা ভালো প্র্যাকটিস ফ্যাসিলিটিস এইজ লেভেলে থাকে, তাহলে আরো ভালো ক্রিকেটার উঠে আসার সুযোগ থাকে।
আমি অবশ্যই আবেদন করব বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাকে পঞ্চগড়ে ভালো প্র্যাকটিস ফ্যাসিলিটিস এর জন্য কিছু দেওয়া হোক। আমাদের উত্তরবঙ্গের একমাত্র ঠাকুরগাঁওতে মোটামুটি একটা স্টেডিয়াম আছে ।
এবার বলুন, বাংলাদেশে আসলে পেসার হিসেবে পেসারদের লাইফটা কেমন? সবকিছু মিলায় যদি বলেন আরকি, ইনজুরি, কামব্যাক, সুযোগ-সুবিধা সবকিছু মিলিয়ে…
দেখেন আমি তো বাংলাদেশেই খেলছি, বাইরের দেশে খেলি নাই, বাইরের দেশে জানি না। সো আমাদের দেশে এটাই জানি যে। হ্যাঁ, বাংলাদেশে এখন যদি আপনি বলেন এখন অনেক ভালো ভালো ফাস্ট বোলার অনেক ভালো লড়াই চলতেছে আরকি। যেটা আমাদের জন্য খুবই ভালো।
এখন আমরা এখানে যে যত ভালো স্কিল প্রমাণ করবে, ভালো খেলে খেলতে পারবে, সেই একদিন খেলবে। এটা অনেক বড় ভালো লাগার জায়গা। কেউ যদি ইনজুরিতে পড়ে তার জন্য রিহ্যাব আছে। তার পিছনে যে ব্যাকআপ সেও যাতে ভালো করে। যাতে সুযোগ পায়। তো আলহামদুলিল্লাহ সবকিছু মিলে অবশ্যই বলবো যে ভালো একটা হেলদি কম্পিটিশন আছে।
তো বাংলাদেশে পেসারদের জীবন বেশ ভালোই বলা যায়?
অবশ্যই! (হাসি)


