রাজনৈতিক দলগুলো ডিসেম্বরের পর সহযোগী ভূমিকায় নেই– এমন অভিযোগ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মো. মাহফুজ আলম। তার আরও অভিযোগ, ‘কিন্তু ঠিকই প্রশাসন, বিচারবিভাগ, পুলিশে তারা স্বার্থ (স্টেইক) নিয়ে বসে আছেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে (এস্টাবলিশমেন্ট) দ্বিদলীয় বৃত্তে ফিরতে এবং ছাত্রদের বাতিল (মাইনাস) করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’
বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে ‘কৈফিয়ত কিংবা বাস্তবতা’ ও বাস্তবতা শিরোনামে একটি দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যমত নেতৃত্বদানকারী সাবেক এই ছাত্র নেতা তার লেখায় সরকারের সীমাবদ্ধতা, কাজের প্রতিবন্ধকতা ও সম্ভাবনার বেশকিছু দিক তুলে ধরেন।
মাহফুজ আলম বলেন, ‘ক্ষমতার ভরকেন্দ্র অনেকগুলো। ফলে কাজের দায় সরকারের, কিন্তু কাজ করে ক্ষমতার অন্যান্য ভরকেন্দ্র। জোড়াতালি দিয়ে গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব না, সম্ভব নয় নূতন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত।’
‘প্রায় তিন ডজন নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ছাত্র মাত্র দু’জন। ছাত্র প্রতিনিধিদেরকেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে(এস্টাবলিশমেন্ট) রাষ্ট্রপতি অপসারণের ঘটনার পর থেকে কোনঠাসা করে রেখেছে। আমরা দু’জন (আরেকজন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ) সর্বোচ্চ ভারসাম্য রক্ষা (ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট) করতে পারছি, কিন্তু প্রভাবক হিসাবে কাজ করতে হলে সরকারে সুষম ছাত্র প্রতিনিধিত্ব লাগবে।’
‘ছাত্রদের কয়েকটি দল হয়ে যাওয়াতে তারা এখন বিভক্ত, তদুপরি অন্য রাজনৈতিক দলের মতই তারা গণ্য (ট্রিটেড) হচ্ছেন। এজন্য নাগরিক কমিটিই ছিল দীর্ঘমেয়াদে অভ্যুত্থানের শক্তি (ফোর্স) হিসাবে টেকসই। যাইহোক! এদিকে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন মঞ্চ (প্লাটফর্ম) দেশব্যাপী ছাত্রদের গুছিয়ে উঠতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অভুত্থানের ছাত্র- জনতা বিভক্ত ও দ্বিধান্বিত,’ যোগ করেন তিনি।
উপদেষ্টা অভিযোগ করে বলেন, ‘সামরিক- বেসামরিক আমলাতন্ত্র আপোষ করেছেন (কম্প্রোম্পাইজড)। মিডিয়া ও ব্যবসায়ে (আওয়ামী) লীগের আধিপত্য কমেনি। লীগের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে হাত দেওয়া যায়নি৷ পুরাতন দ্বিদলীয় বন্দোবস্ত টিকে গেছে। বিচার বিভাগ এখনো দ্বি-দলীয় বৃত্তে বন্দী।’
‘বাম-ডানের কালচারাল দ্বন্দ্ব (ক্যাচাল) জুলাইকে দুর্বল করেছে এবং শাহবাগ- শাপলাকে চিরন্তন করে তুলেছে। ডানপন্থীরা ভুল রাজনীতি করেছেন এবং নূতন বাস্তবতায় আবগের বশে প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা রেখেছেন। বামপন্থীরা প্রথম থেকেই সরকারের প্রতি এড়ানো (স্কেপ্টিক্যাল) এবং অভ্যুত্থানের পক্ষে জোরদার ভূমিকা রাখতে অসফল’, উল্লেখ করেন তিনি।
তার আরও অভিযোগ, ‘সবচেয়ে আত্মত্যাগী (ডেডিকেটেড) ছাত্রকর্মীরা নাম কামানো (ক্রেডিট), দলবাজি আর গোষ্ঠী (কোরাম) বাজির খপ্পরে পড়েছেন। আর্থিক অস্বচ্ছতার অভিযোগ হাতেগোনা কয়েকজনের বিরুদ্ধে, কিন্তু হতাশ (ডিমোরালাইজড) হয়েছে সমগ্র ছাত্র- জনতা। ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থানের পক্ষের প্রতিষ্ঠান ও নূতন সুশীল সমাজ (সিভিল সোসাইটি) গড়তে ব্যর্থ হয়েছেন। সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক জোট (এলায়েন্সের) ক্ষেত্রে ছাত্র- জনতার কোন হিস্যা নেই।’
‘শহিদ- আহতদের ক্ষেত্রে এবং বিচারের প্রশ্নে সরকারসহ সকল অংশীজন অসফল। অভ্যুত্থান শহর ছেড়ে গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত হয়নি৷ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে (এস্টাবলিশমেন্ট) ও রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থবাদী চিন্তা ও কর্মের সাথে সাথে ছাত্রদের অনভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার অভাব এজন্য দায়ী,’ বলেন তিনি।
তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, ‘সর্বোপরি ছাত্রদের বাতিল (মাইনাস) করে (ছাত্রদের ব্যর্থতা অনস্বীকার্য বটে) দ্বিদলীয় বন্দোবস্তে ফেরার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে (এস্টাবলিশমেন্ট) অপেক্ষমান। ছাত্রদের পরিপূর্ণ অসহযোগিতার মুখে ইতোমধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে।’
উপসংহারে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘সমাধান? রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে (এস্টাবলিশমেন্টে) ছাত্রদের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা এবং ফ্যাসিবাদী শক্তি ও তার দালালদের বিরুদ্ধে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে আঘাত করা। এগুলোন করার পূর্বশর্ত হল, ছাত্রদের মধ্যে সততা, আদর্শ, নিষ্ঠা ও ঐক্য ফিরিয়ে আনা। পুরাতন বন্দোবস্তের সৈনিকদের অকার্যকর করে তোলা।’
ওই পোস্টের মন্তব্যে জবাবে তথ্য উপদেষ্টা জানান, ছাত্র নেতারা ক্ষমতা ছাড়বেন না।


