‘এখানেই আদালত, এখানেই বিচার’

‘এখানেই আদালত, এখানেই বিচার’
Advertisement
Advertisement

প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই পরিচালিত জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার বা জেআইসিতে কাটানো নিজের বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতার দীর্ঘ বিবরণ আদালতে তুলে ধরেছেন প্রসিকিউশনের সাক্ষী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের ইকবাল চৌধুরী।

তিনি জবানবন্দিতে বলেন, জেআইসিতে আমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। আমাকে বলা হয়েছে, ‘এখানে বাইরে থেকে কেউ আসতে পারে না, আবার এখান থেকে বের হওয়া যায় না। এখানেই আদালত, এখানেই বিচার হয়।’ আমি সেখানে হিন্দিতে কথা বলতে শুনেছি।

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের সাক্ষী হিসেবে নিজের বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ইকবাল চৌধুরী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ জেআইসিতে সংঘটিত গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার শুনানি গ্রহণ করে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বর্তমান ও সাবেক ১২ জন সেনা কর্মকর্তা এ মামলায় আসামি।

গত ২ মার্চ ইকবাল চৌধুরীর জবানবন্দি গ্রহণ শুরু হয়। তার জবানবন্দি গ্রহণ শেষে জেরার জন্য শুনানি ৩০ মার্চ পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। এর আগে ১৮ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়।

জবানবন্দিতে সাক্ষী জানান, বন্দি থাকার সময় তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও কেন তিনি আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখি করেন। তার জবাব ছিল, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ এবং বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি লেখালেখি করেন।

তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও কেন তিনি আওয়ামী লীগ করেন না। একদিন তাকে বলা হয়, ‘তুই ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে এসে যুদ্ধ করে আবার ভারতের বিরুদ্ধেই কথা বলিস!’ বলতে বলতে তার দুই পায়ের হাঁটুতে, হাঁটুর নিচে এবং পায়ের গোড়ালিতে মোটা লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। প্রচণ্ড আঘাতে তিনি ‘মাগো’ বলে চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন।

রুমে গিয়ে দেখেন তার দুই পায়ের হাঁটু, হাঁটুর নিচে ও গোড়ালি ফুলে গেছে এবং লাল হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

অন্য একদিন জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার ওপর অমানবিক নির্যাতন করা হয়। তার বাম হাতের অনামিকা আঙুলে প্লায়ার্স ক্লিপ এবং ডান কানে আরেকটি ক্লিপ লাগিয়ে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়। ফলে তার বাম হাতের অনামিকা আঙুলের নখ আংশিক নষ্ট হয়ে যায় এবং বাম হাতের অনুভূতি কমে যায়।

ভারতবিরোধী লেখালেখির প্রসঙ্গ টেনে তার ওপর অত্যাচার করা হয়। যারা তাকে অত্যাচার ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, তাদের মধ্যে একজনকে হিন্দিতে কথা বলতে শুনেছেন।

ইকবাল চৌধুরী বলেন, রুমে থাকা অবস্থায় ট্রেন, হেলিকপ্টার ও বিমান চলাচলের শব্দ শুনতে পেতাম। একদিন দুপুরে আমাকে ভালো খাবার দেওয়া হয়। খাবারে পোলাও, গরুর মাংসের ভুনা, দই ও মিষ্টি ছিল। খাবারের বিষয়ে প্রহরীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, সেদিন ১৬ ডিসেম্বর।

কিছুদিন পর প্রতিদিন সন্ধ্যায় মাইকে নির্বাচনী প্রচারণা শুনতে পাই। একদিন হঠাৎ পাশের মাইকের ঘোষণা থেকে বুঝতে পারি, আমি ক্যান্টনমেন্টের কাছে বা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে ডিজিএফআইয়ের নিয়ন্ত্রণে আছি। কারণ ডিজিএফআই সদর দপ্তর কাফরুল এলাকায় অবস্থিত।

এর কিছুদিন পর দুপুরে গোসলের পরে বাথরুম থেকে বের হওয়ার সময় পূর্বপরিচিত লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানকে দেখতে পাই। আমরা না চেনার ভান করি।

আরও কয়েক মাস পর দুপুরে খাবারের সময় ভাতের সঙ্গে বড় কাতলা মাছের ভুনা এবং আমের ডাল দেওয়া হয়। খাবারের বিষয়ে প্রহরীকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারি, সেদিন ছিল বাংলা নববর্ষ।

৭–৮ দিন পরে রাতে দুজন ব্যক্তি আমার রুমে প্রবেশ করে। কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে দুই হাতে হ্যান্ডকাফ লাগায়। আমাকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে একটি টুলে বসায়।

জানানো হয়, আমাকে বাসায় পৌঁছে দিতে সর্বোচ্চ মহলের আদেশ হয়েছে। শর্ত হলো, বাইরে গিয়ে গুমজীবনের বিষয়ে কিছু বলা যাবে না।

সাক্ষী বলেন, আমার ওপর যে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন ও নিপীড়ন করা হয়েছে এবং আমাকে গুম করে রাখা হয়েছে, তার বিচার চাই। আমি মনে করি তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা, মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দীকি, ডিজিএফআইয়ের ডিরেক্টর জেনারেল এবং ওই সময় জেআইসির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারাই দায়ী। তাদের বিচার চাই।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad