সত্তর দশকে ‘রূপবান’ মুক্তির পর এ দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। উর্দু-হিন্দি ছবির দাপুটে বাজারে বাংলা ছবির বাজারের সূচনা শুরু হয় ছবিটি দিয়ে। একের পর বাংলা ছবি তৈরি হতে থাকে। দর্শকরা রাজ্জাক, কবরী, শাবানা, ফারুকদের ছবি দেখতে শুরু করেন। তৈরি হয় দেশি ছবির চাহিদা। তৈরি হয় একের পর এক সিনেমা হল। ৮০ দশকের শেষে এর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৭ শতাধিক।
‘বেদের মেয়ে জোসনা’ মুক্তির পর দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা আরেক দফা বাড়ে। সিনেমা হল মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি’র তথ্য মতে ১৯৯৮ সালে এ সংখ্যা ছিল রেকর্ড ১২৩৫।
কিন্তু নতুন শতাব্দীতে এ সংখ্যা আর বাড়েনি, বরং কমেছে। কমতে কমতে ১৫০-তে এসে ঠেকেছে। নিয়মিত চলে ৭০টির মত হল। গেল এক সপ্তাহে যশোরের বিখ্যাত মণিহার, দিনাজপুরের মডার্ণ, কেরানীগঞ্জের লায়ন, বগুড়ার মধুবন মালিক তাদের সিনেমা হল বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এমনটিতে দেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি দুরবস্থায়, তার মধ্যে নতুন করে সিনেমা হল বন্ধের খবর দেশের সিনেমাপ্রেমীদের জন্য দুঃস্বপ্নের মত।
ছবি নেই হলে চালানোর মত!
টাইমস অব বাংলাদেশ বন্ধ হয়ে যাওয়া হল মালিকসহ ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছে। সবাই এর পিছনে বেশ কিছু কারণ বললেও এক ব্যাপারে একমত ‘ছবি নেই চালানোর মত’।
৪ কোটি টাকা খরচ করে ২০২১ সালে ৩৩৬ আসন নিয়ে বগুড়ায় চালু হয় মধুবন সিনেপ্লেক্স। এর স্বত্বাধিকারী রোকনুজ্জামান ইউনূস বলেন, ‘ছবিই তো নেই। কতদিন লোকসান দিয়ে হল চালাবো। গেল তিন মাসে ১০ লাখ টাকা বিদ্যু বিল এসেছে। এর মধ্যে এখনো ৬ লাখ টাকা বাকি।’
নিজের মালিকানার পাশাপাশি বেশ কিছু হল পরিচালনা করেন চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিয়া আলাউদ্দিন। তিনি জানান, তার তত্ত্বাবধানে চলা দুটি হলে গতকাল সারাদিনে দর্শক ছিল ৫-৭ জন করে। ‘আমাদের দেশের ছবি দেখার মত দর্শক নেই, এ কথা ঠিক না। তা হলে শাকিব খানের ছবিগুলো কীভাবে সবশ্রেণীর দর্শকরা দেখছে। কীভাবে ছবিগুলো ব্লকবাস্টার হচ্ছে। সমস্যা হচ্ছে ভালো ছবি নেই।’
চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল বলেন, ‘শুধু দুই ঈদের বাইরে আমাদের হলগুলোতে চালানোর মত ছবি পাওয়া যায় না। নানা ধরণের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ভারতীয় বা বিদেশি ছবি আমদানি করতে পারছে না আমদানিকারকরা। তাহলে একজন হল মালিক কেনো তার হল খোলা রাখবে।’
দেশের পরিস্থিতির কারণেও বন্ধ
গেল বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেশ কিছু সিনেমা হলে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে তখন ১০টির বেশি হল হামলার শিকার হয়েছে বলা হয়। আবার সম্প্রতি টাঙ্গাইলে শাকিব খানের ছবি প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়ার মত ঘটনা ঘটেছে।
অল্প সময়ে সিরাজগঞ্জের রুটস সিনে ক্লাব চলচ্চিত্রের মানুষদের নজর কেড়েছিল। এ হলটি ভাঙচুরের পরে এখন পর্যন্ত চালু হয়নি। রুটসের চেয়ারম্যান সামিনা ইসলাম নীলা বলেন, ‘মবের কারণে রুটস্ সিনেক্লাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়; এতে আমাদের প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আমরা নতুন করে বিনিয়োগ করে হল সংস্কার করি। কিন্তু নিয়মিত মানসম্পন্ন দেশি ছবির অপ্রতুলতা, বিদেশী চলচ্চিত্রের আমদানী জটিলতার কারণে আমরা হল খোলার আগ্রহ হারিয়েছি। নিয়মিত চলচ্চিত্র না পেলে আমাদের পক্ষে মাসিক সকল খরচ কোনোভাবেই ভর্তূকি দেওয়া সম্ভব নয়!
উত্তরাধিকারদের মধ্যকার বন্ধ
রাজধানীর বলাকা হল বন্ধ হয়ে যায় করোনাকালীন ২০২০ সালের মার্চে। এর বন্ধের পিছনে কারণ হিসেবে জানা গেছে এর প্রয়াত মালিক আলী ইমামের দুই সংসারের স্ত্রী-সন্তানের মধ্যকার উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব। এরকমভাবে দেশের অনেক হল বন্ধের পিছনে রয়েছে ‘উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্ব’।
চলচ্চিত্র গবেষক ও নির্মাতা মীর শামসুল আলম বাবু বলেন, ‘দেশের অধিকাংশ সিনেমা হল ওই এলাকার প্রধান সড়কের পাশে। যার কারণে সময়ের সঙ্গে সিনেমা হলের জমির দাম বেড়েছে। সিনেমা ব্যবসা কমেছে। মালিকের ছেলে মেয়েদের মধ্যে কেউ হয়তো ব্যবসা চালিয়ে রাখতে চাইছে, কেউ আবার হয়তো চাইছে না। এর কারণ হচ্ছে ওই জায়গায় মার্কেট করলে সিনেমা হলের চেয়ে কয়েকগুণ আয় করা যায় প্রতি মাসে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ মিরপুরের সনি সিনেমা।’
‘সবকিছু মিলিয়ে অতিরিক্ত লাভের আশায় কেউ হয়ত মার্কেট করছেন। আবার এ হয়তো উত্তরাধিকার সূত্রে কে মালিকানা পাবে, তা নিয়ে সুরাহা করতে না পারায় হল বন্ধ রেখেছেন।’ এ বিষয়টি হল মালিক সমিতির নেতারাও স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে এর সংখ্যা খুবই কম বলে দাবি তাদের।
ওটিটি কি দায়ী?
করোনার পর থেকে দেশে ওটিটির উত্তরণ ঘটেছে। দেশীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোতে বর্তমানে ছবি মুক্তির দু-তিন মাসের মধ্যে ছবি মুক্তির হিড়িক পড়েছে। সিনেমা হল বন্ধের পিছনে অনেকে ওটিটিকে দায়ী করেন। তবে এ বিষয়ে একমত নন মিয়া আলাউদ্দীন।
ষাট বছরের বেশি সময় ধরে সিনেমা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মিয়া আলাউদ্দীন বলেন, ‘যখন ষাটের দশকে টেলিভিশন আসলো তখন থেকেই শুনে আসছি সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাবে। এরপর ভিসিআর, সিডি আসলো। সবসময় আমরা সাময়িক সময়ের জন্য ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। আবার কিন্তু হলে দর্শক এসেছে। কারণ দর্শক সিনেমা হলেই ছবি দেখতে চায়।’
সরকারের অসহযোগিতার অভিযোগ
মধুবনের রোকনুজ্জামান ইউনূস দাবি করেন গেল এক বছরে বেশ কয়েকবার তথ্য উপদেষ্টার সঙ্গে হলের সমস্যা নিয়ে মালিকরা দেখা করতে গেলেও দেখা পাননি। তিনি বলেন, ‘উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের পর মাহফুজ আলমের সঙ্গে আমরা দেখা করতে গিয়েছিলাম। ওনারা কেউই আমাদের দেখা দেননি। একবার সচিবের সঙ্গে মিটিং হয়েছে শুধু।’
চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিয়া আলাউদ্দিন বলেন, ‘অনুদান দিয়ে চলচ্চিত্র বাঁচানোর চেষ্টা করছে সরকার। কিন্তু হল না থাকলে ছবি চালাবেন কোথায়? আমাদের দিকে তো কারও দৃষ্টি নেই। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিটিংয়ের পর মিটিং করে গেলাম গত কয়েক বছর, কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই। সাফটায় ছবি আমদানি থেকে যৌথ প্রযোজনার নিয়ম সহজ করার যৌক্তিক প্রস্তাব দেওয়া হলো, কিন্তু এসবের কোন অগ্রগতি নেই। আসলে এই ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে কারও দরদ নেই। এটা থাকলেই কি আর না থাকলেই কি।’
বিদেশি ছবিতেই উত্তরণ!
২০২৩ সালে এক সরকারি আদেশে ভারত থেকে পরবর্তী দুই বছরে ১৮টি হিন্দি ছবি আমদানীর অনুমতি দেওয়া হয়। সাফটা চুক্তির আওতায় এ আদেশের পর ১০টি ছবি আমদানি হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সরকার পরিবর্তনের পর এ আমদানি ধমকে আছে। সবশেষ গেল বছরের ১ নভেম্বর হিন্দি ‘স্ত্রী ২’ এবং ১৮ জুলাই নেপালী ছবি ‘মিসিং’ মুক্তি পায়। হল মালিকরা চান বিশ্বের যে কোন দেশের ছবি আমদানির সুযোগ।
‘যদি সরকার বিশ্বের সব দেশের চলচ্চিত্র আমদানী সহজ করেন, এবং বছরে ১০/১২টি চাহিদাসম্পন্ন বাংংলা চলচ্চিত্র পাওয়া সম্ভব হয়; তবেই এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব,’ বলেন সামিনা ইসলাম নীলা ।
তিনি যুক্ত করেন, ‘আমদানী অনুমতির পাশাপাশি এবং বক্স-অফিস, ই-টিকেটিং, সেন্ট্রাল সার্ভার চালু করা গেলে মাত্র ৫ বছরে হল সংখ্যা পাঁচ শতাধিক অতিক্রম করবে।’
রোকানুজ্জামান ইউনূস বলেন, ‘আমাদের দেশীয় ছবি পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে তাহলে তো বিদেশি ছবি চাইবো না। কিন্তু এর আগে তো বিদেশি ছবি উন্মুক্ত করে দিতে হবে হল টিকিয়ে রাখতে।’


