ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তিচুক্তির জেরে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু টানাপোড়েন তীব্র

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তিচুক্তির জেরে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু টানাপোড়েন তীব্র
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি ঘোষণার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে তীব্র টানাপোড়েন চলছে।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ যুদ্ধ শুরুর মাধ্যমে তেহরানের বহু বছরের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং এর মাধ্যমে তিনি নিজ দেশে নির্বাচনের আগে ‘রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক’ অবস্থানে পৌঁছাবেন। মূলত তিনি নিজেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের ‘স্থপতি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে দেবে।

কিন্তু ইরানের সঙ্গে তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের বাস্তবতা পুরোপুরি আলাদা। ইসরায়েলের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা এই প্রধানমন্ত্রী এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে নিরব যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন। কারণ, ট্রাম্পও যেকোনোভাবে যুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজছেন।

শোনা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করেই ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে দুই নেতার লক্ষ্যই এখনো অপূর্ণ থেকে গেছে। এর মধ্য দিয়ে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানও কার্যত আটকে গেছে। ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে রাজি হওয়ার অন্যতম শর্ত ছিল লেবাননের ফ্রন্ট লাইনে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে খুবই সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন, কারণ তারা তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষুব্ধ করতে চান না। তবে নিজেদের গোপন আলোচনায় ওয়াশিংটনের প্রতি অসন্তোষ স্পষ্ট।

দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট গত সপ্তাহে প্রথম যখন বলেন- ইরানের সঙ্গে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত, তখন ইসরায়েল বিষয়টি নিয়ে বিস্মিত হয়েছিল। এই আলোচনায় প্রভাব বিস্তারে ইসরায়েল খুব একটা সফল হয়নি।

এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তিটি ইসরায়েলের জন্য “খুবই খারাপ” হয়েছে। ইসরায়েলি নেতৃত্বের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সেনাপ্রধান পর্যন্ত কেউই এই মূল্যায়নের বাইরে নন।’

অন্যদিকে ওয়াশিংটন বলছে, আগামী ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময় তেহরানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মূল উদ্বেগ-ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিবেচনায় নেওয়া হবে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, এই আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমাধানের সময়সীমা আরও বাড়তে পারে, যা ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপকে সীমিত করে ফেলবে এবং তাদের মূল উদ্বেগ অমীমাংসিতই থেকে যাবে।

আরও পড়ুন

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প বহুবার মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়েছেন। বিশেষ করে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধের প্রশ্নে তাদের ভিন্ন অবস্থান স্পষ্ট।

চলতি মাসের শুরুতেই লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে হামলা চালানোর জেরে নেতানিয়াহুর প্রতি ক্ষুব্ধ হন ট্রাম্প। এক ফোনালাপে তিনি নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে অভিহিত করেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে, তখন বৈরুত আক্রমণ না করার নির্দেশ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ওই দিন ট্রাম্পের নির্দেশ মেনে নেতানিয়াহু আক্রমণ স্থগিত করলেও এক সপ্তাহ পর ফের বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে আবার হামলা চালান। ওই হামলার পর ইরান শান্তি চুক্তি আলোচনা থেকে পিছিয়ে আসার ঘোষণা দেয় এবং ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।

এমনকি সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রাথমিক চুক্তি ঘোষণা হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেও ইসরায়েল লেবাননের রাজধানীতে হামলা চালিয়েছে। তেলআবিবের দাবি, বৈরুতের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের দিকে রকেট ছোড়া হয়েছিল। ট্রাম্প অবশ্য এটিকে ‘ছোট এবং অপ্রাসঙ্গিক’ ঘটনা বলে মন্তব্য করেছেন।

পরে এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইসরায়েল “শক্তিশালী ও স্থিতিশীল” অবস্থানে রয়েছে এবং নেতৃত্ব দৃঢ় ও বিচক্ষণভাবে কাজ করছে।’ ওই সংবাদ সম্মেলনেই তিনি স্বীকার করেন, তার ও ট্রাম্পের মধ্যে কখনো কখনো মতবিরোধ হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, আমি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। অনেক সময় আমরা একই দৃষ্টিতে দেখি, আবার অনেক সময় ভিন্নভাবে দেখি। ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থের দায়িত্ব আমার হাতে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়ার আগেই নেতানিয়াহু হারার পূর্বাভাসের মধ্যে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি জনগণের বিশ্বস্ততা ফিরে পেতে তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে আরও আগ্রহী হতে পারেন। জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েলি জনগণের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে আগের তুলনায় বেশি সন্দিহান হয়ে উঠেছে।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান শাপিরো বলেন, ‘এটি স্বার্থের একটি স্পষ্ট বিভাজনের মুহূর্ত। নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে চুক্তির বিরোধিতা না করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতে জড়াতে চাইবেন না, তবে ইসরায়েল যে এই চুক্তিতে বাধ্য নয় তা ইঙ্গিত দেবেন।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তি ইসরায়েলি জনমনে নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র-সম্পর্কিত রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক তৈরি হয়েছে, তা আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তির বিস্তারিত শর্তগুলো এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান জানিয়েছে, এতে সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা রয়েছে, যার মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত।

নেতানিয়াহু এক হুঁশিয়ারিতে বলেন, ‘ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে নিজেদের বাহিনী রাখবে এবং হিজবুল্লাহর হামলার বিরুদ্ধে “অপারেশনাল স্বাধীনতা” বজায় রাখবে। ইরান আমাদের সেখান থেকে সরে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি দৃঢ় ছিলাম।’

বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জোনাথন রিনহোল্ড বলেন, ‘নেতানিয়াহু ইসরায়েলি জনগণের কাছে এই চুক্তি বিক্রি করতে পারবেন না। এই মুহূর্তে তাদের সবচেয়ে ভালো চাওয়া হতে পারে–তেহরান ও ওয়াশিংটনের আলোচনা ব্যর্থ হওয়া এবং ৬০ দিনের মধ্যে আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে তা ইসরায়েলের পক্ষে যাওয়া।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad