ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন, ২০২৫-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন করেছে উপদেষ্টা পরিষদ।
সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী, কোনো মামলার পলাতক আসামি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। এ ছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার বাতিল করা হয়েছে, বহাল করা হয়েছে ‘না ভোট’।
বৃহস্পতিবারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় আরপিও সংশোধনের অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে সভা শেষে ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
তিনি বলেন, ‘প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতায় পলাতক ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চান, ‘পলাতক আসামি’ বলতে কাদের কথা বোঝানো হয়েছে।’
জবাবে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘পলাতক হচ্ছে—আদালত যখন পলাতক ঘোষণা করে। যেদিন আদালত আপনাকে আসতে বলছে, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে, আসছেন না—আদালত পলাতক ঘোষণা করে। বিচার চলাকালীন পলাতক হয়।’
বাংলাদেশে বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন কারাগারে, অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে রয়েছেন। আবার আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই মাথায় মামলা ও পরোয়ানা নিয়ে পলাতক।
অর্থাৎ, এসব মামলার সুরাহা না হলে বা আদালতে আত্মসমর্পন না করলে দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়েও এদের কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
আসিফ নজরুল জানান, উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ২০২৫ চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়েছে। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আইন নীতিগতভাবে অনুমোদন পেয়েছে।
আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘আরপিওতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী হলো—ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) সংক্রান্ত বিধান বাতিল করা। পাশাপাশি “না ভোট” পুনর্বহাল করা হয়েছে, যাতে কোনো নির্বাচনী আসনে কেবল একজন প্রার্থী থাকলে ভোটাররা তাকে ভোট না দেওয়ার সুযোগ পান।’
‘২০১৪ সালের সাজানো নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেই এই বিধান আনা হয়েছে। একজন প্রার্থী থাকলে ভোটাররা যদি তাকে পছন্দ না করেন, “না ভোট” দিতে পারবেন। তখন সেই আসনে পুনরায় নির্বাচন হবে।’
নতুন সংশোধনীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জেলাভিত্তিক নির্বাচন অফিসগুলোতে দায়িত্ব পালন করবেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। প্রার্থীদের দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে আয় ও সম্পত্তির বিবরণ হলফনামায় দিতে হবে, যা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করা হবে।
আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রত্যেক প্রার্থীর দেশি-বিদেশি আয় ও সম্পত্তির পূর্ণ বিবরণ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। জনগণ যেন সহজেই জানতে পারেন তাদের প্রার্থীর আর্থিক অবস্থা কী।’
সংশোধনীর মধ্যে, নির্বাচনী জামানতের পরিমাণ ২০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৫০০ টাকা করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলকে ৫০০ টাকার বেশি অনুদান বা চাঁদা দিতে হলে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার বাধ্যতামূলক এবং অনুদানদাতার ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে হবে। বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী ভোটার ও নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তারা ডাক ভোটে ভোট দিতে পারবেন। ভোট গণনার সময় গণমাধ্যমের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক অনিয়ম হলে পুরো এলাকার ভোট বাতিল করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হয়েছে।
আইন উপদেষ্টা জানান, জোটের প্রার্থীদের প্রতীক ব্যবহারে স্বচ্ছতা আনতে বিধান যোগ করা হয়েছে, যাতে ভোটাররা সহজেই বুঝতে পারেন—কোন দল থেকে প্রার্থী হচ্ছেন।
ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।


