ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলগুলোতে অস্বাস্থ্যকর ও নিম্নমানের খাবার পরিবেশন শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘকাল ধরে একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, এই পরিস্থিতি তাদের মধ্যে অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবন ও একাডেমিক ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন তাতে কোনো অর্থবহ উন্নতি হয়নি।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আমানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই আবাসন ও খাবার সমস্যা এক নিরুৎসাহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আবাসন ও খাবারের সমস্যা আমাকে পড়াশোনায় নিরুৎসাহিত করছে। পুষ্টিকর খাবার ছাড়া পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার শক্তি আমি কোথায় পাব?’
আমান আরও যোগ করেন, বেশ কয়েকজন শিক্ষক খাদ্যের গুণমান নিয়ে কাজ করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছেন, যেখানে দেখা গেছে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় চাহিদার তুলনায় অনেক কম পুষ্টি পাচ্ছেন।
আমান প্রশ্ন তোলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে তাদের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা না হলে তারা দেশের উন্নয়নে কীভাবে অবদান রাখবে?’
২০২৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের গবেষকদের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ক্যানটিনের খাবারে ই-কোলাইসহ ১৪ ধরনের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করা হয়েছে। অথচ এই গবেষণা প্রকাশের কয়েক বছর পরেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন খাদ্য নিরাপত্তা পুনর্মূল্যায়নে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
এই অভিযোগগুলোর পেছনে রয়েছে এক জটিল ‘ব্লেম-গেম’ বা কাদা ছোড়াছুড়ি। শিক্ষার্থীরা ক্যানটিন পরিচালকদের অবহেলা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতাকে দায়ী করেন। অন্যদিকে, ক্যানটিন মালিকদের দাবি, তারা ক্রমবর্ধমান খরচ এবং খাবারের নির্ধারিত কম দামের গ্যাঁড়াকলে আটকে আছেন।
আবাসিক শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনের খাবারের জন্য হলের ক্যানটিন, ক্যাফেটেরিয়া, মেস ও এক্সটেনশনের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু অনেকের মতে, এসব জায়গার অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা তাদের অন্য কোথাও যেতে বাধ্য করে। পুষ্টির অভাব, নিম্নমানের উপকরণ, অস্বাস্থ্যকর রান্নার পরিবেশ এবং পরিচ্ছন্নতার অভাবে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই কাছের হোটেলগুলোতে যান অথবা নিজেদের রুমে রান্না করেন। পাঁচটি ছাত্রী হলের চিত্রও একই রকম বলে জানিয়েছেন তারা।
বর্তমানে খাবারের দাম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। মাছ বা মুরগির মিল সাধারণত ৫০ থেকে ৬০ টাকা, গরুর মাংস বা খাসির মাংসের পদের দাম ৮০ থেকে ৯০ টাকা এবং ডিম কারি প্রতি প্লেট প্রায় ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়। মিলের মধ্যে ডাল এবং ‘আনলিমিটেড’ ভাত অন্তর্ভুক্ত থাকে।
ক্যানটিন মালিকরা বলছেন, এই কাঠামোর মধ্যে মান উন্নয়ন করা অসম্ভব। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের একজন বিক্রেতা বলেন, ‘শিক্ষার্থীরাই আমাদের প্রধান গ্রাহক এবং আমরা ভালো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু বর্তমান বাজারমূল্যে এত কম হারে আমাদের পক্ষে সামলানো সম্ভব নয়।’
মুবাশ্বির মাহমুদ নিবিড়ের মতো শিক্ষার্থীদের কাছে এই সমস্যাটি কেবল দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের যদি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামান্যতম উদ্বেগ থাকত, তবে ক্যাম্পাসে অন্তত কয়েকটি স্বাস্থ্যকর খাবারের দোকান দেখা যেত।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ছাত্র নেতৃত্ব আগে আগ্রহ দেখালেও কাজ হয়নি। তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের আগে ও পরে ক্যাম্পাস নেতারা খাবারের মান নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের উচিত ছিল সঠিক নির্দেশিকা দেওয়া এবং প্রতিটি ক্যানটিন ও ক্যাফেটেরিয়ায় তদারকি নিশ্চিত করা। খাবারের মান নিশ্চিত করতে বাবুর্চিদের অন্তত ন্যূনতম যোগ্যতা থাকা উচিত।’
অসন্তোষ শুধু পুষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। খাবারে পোকামাকড় পাওয়ার খবর একটি নিয়মিত অভিযোগে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন হলে পরিবেশন করা ভাত ও তরকারিতে পোকা পাওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হাসিবুল আলম তাহিন হলের রান্নাঘরের ভেতরের সমস্যার কথা বর্ণনা করে বলেন, ‘খাবারে তেলাপোকা, রাবার ব্যান্ড, সুতা এবং আরও অনেক কিছু পাওয়া যায়। এরপর ক্যানটিনে কেউ কীভাবে খেতে পারে?’ এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে তা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকবে বলে জানান তিনি।
ক্রমবর্ধমান হতাশার মাঝে ভর্তুকি এবং কঠোর নজরদারির বিষয়টি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে সামনে এসেছে। শিক্ষার্থী তাহিন বলেন, ‘হলের খাবারের মান বাড়াতে যদি ভর্তুকি চালু করা হয়, তবে সমস্যার আংশিক সমাধান হতে পারে। তদারকির জন্য ক্যানটিনগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো যেতে পারে। প্রশাসনকে এ বিষয়ে আন্তরিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আর্থিক সক্ষমতা এবং ক্যানটিন বাজেটের কথা বিবেচনা করে প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। সরকার যদি বরাদ্দ বাড়ায়, আমরা স্বাগত জানাব। ভর্তুকির মাধ্যমে প্রশাসন শিক্ষার্থীদের জন্য আরও ভালো খাবারের ব্যবস্থা করতে পারবে।’
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রাধ্যক্ষ মো. নুরুল আমিন জানান, ভর্তুকি খাবারের মান বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় এমন কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেবে কি না বা এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না সে সম্পর্কে তিনি অবগত নন।
তিনি বলেন, ‘মূল সমস্যা হলো শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ করা বাজেটের মধ্যে গ্রহণযোগ্য খাবারের মান নিশ্চিত করা। আমরা সেই সীমার মধ্যে মান বজায় রাখার চেষ্টা করছি এবং মান কীভাবে আরও বাড়ানো যায় সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনা করছি।’
প্রাধ্যক্ষ স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক আবদুল্লাহ-আল-মামুন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি হলে একজন হাউজ টিউটরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য হল সংসদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। যেসব ক্যানটিনের খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে সেগুলোকে নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে।’
তিনি জানান, কিছু হলে সীমিত ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে এবং প্রাধ্যক্ষ স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় খাবারের মান ও হলের পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা ও শিক্ষার্থীদের মতামত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তবে এত সব আশ্বাসের মাঝেও হলের বাস্তব চিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি। কম দামের খাবার ও বারবার দেওয়া প্রতিশ্রুতির ভিড়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন সেই মানহীন খাবারই খেতে বাধ্য হচ্ছেন, যা নিয়ে তাদের মনে প্রতিদিন সংশয় জাগে।


