বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ পরিচয় নেই–সরকারের দুই মন্ত্রীর এমন বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদ জানিয়েছে দেশের ২৫টি আদিবাসী ছাত্র, যুব, নারী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। একই সঙ্গে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার এবং জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে সংগঠনগুলো।
বৃহস্পতিবার এক যৌথ বিবৃতিতে এসব দাবি জানানো হয়। বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মনিরা ত্রিপুরা বিবৃতিটি পাঠিয়েছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১১ আগস্ট ঢাকার একটি হোটেলে চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিএইচটিআরএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের সব নাগরিকের সাংবিধানিক পরিচয় ‘বাংলাদেশি’ এবং দেশে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই।
একই অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকে অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেন।
দুই মন্ত্রীর এসব বক্তব্যকে ‘আপত্তিকর, ইতিহাস ও বাস্তবতাবিবর্জিত’ উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির দেশ। বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ৫০টির বেশি জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘকাল ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রথা ও জীবনধারা নিয়ে দেশে বসবাস করে আসছে।
বিবৃতিদাতা সংগঠনগুলো বলেছে, মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ থাকলেও স্বাধীনতার পরও তারা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাদের মতে, আদিবাসীদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়ার পরিবর্তে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এমন বক্তব্য তাদের আরও প্রান্তিক করে তুলছে।
জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র (ইউএনড্রিপ) প্রসঙ্গেও মন্ত্রীদের বক্তব্যের সমালোচনা করা হয় বিবৃতিতে।
এতে বলা হয়, ২০০৭ সালে ঘোষণাপত্র গৃহীত হওয়ার সময় বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত থাকলেও জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে এর নীতিগুলো অনুসরণ ও বাস্তবায়নের নৈতিক দায় রয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণাপত্রের বিপক্ষে ভোট দিলেও পরবর্তী সময়ে দেশগুলো নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে ঘোষণাপত্রের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
বাংলাদেশও এসব উদাহরণ বিবেচনায় নিয়ে বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র নির্মাণে এগোতে পারে বলে মত দিয়েছে সংগঠনগুলো।
সালাহউদ্দিন আহমদের ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করার’ বক্তব্যেরও সমালোচনা করা হয়েছে যৌথ বিবৃতিতে। সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এমন দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে আদিবাসীদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, জীবনাচরণ ও বিশ্বাসের বিকাশ নিশ্চিত না করে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে একীভূত করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
বিবৃতিতে সরকারকে ‘একরৈখিক ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি’ থেকে সরে আসার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে ন্যায়, সমতা, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীগুলোকে জাতিগতভাবে ও আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
সংগঠনগুলোর চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশের আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া; আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ ভূমি, ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার প্রতিষ্ঠা; সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জ্ঞান সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করা এবং জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র-২০০৭ বাস্তবায়ন করা।
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিল, ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফোরাম, বম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ম্রো স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ খুমী স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ খেয়াং স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন, বাংলাদেশ গারো স্টুডেন্ট ফেডারেশন, বাংলাদেশ হাজং ছাত্র সংগঠন, হাজং স্টুডেন্ট কাউন্সিল, বাংলাদেশ গারো স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, খাসিয়া স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম ও বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আদিবাসী শিক্ষার্থী সংগঠন।


