ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় যোগ দিতে সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং যুদ্ধ বন্ধে হওয়া সমঝোতা স্মারক এগিয়ে নিতে ইরানি নেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করার লক্ষ্যে রোববার সুইজারল্যান্ডে পৌঁছান তিনি।
স্থানীয় সময় শনিবার ওয়াশিংটন ডিসির কাছে জয়েন্ট বেজ অ্যান্ড্রু থেকে এয়ার ফোর্স টু তে সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট। সঙ্গে আছেন মার্কিন সেকেন্ড লেডি ও তার স্ত্রী ঊষা ভ্যান্সও।
অবশ্য এর আগে শনিবার হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল, বৈঠকে জেডি ভ্যান্সের পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ অংশ নেবেন। এর আগেও ইসরায়েল-লেবানন সংঘাতের জেরে শান্তি আলোচনা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হওয়ায় সব ধরনের প্রস্তুতি সত্ত্বেও সুইজারল্যান্ড সফর বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিলেন জেডি ভ্যান্স।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা এগিয়ে নিতে ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক সই করেন। কাঠামোগত চুক্তির পর দুই দেশের শীর্ষ আলোচকেরা ৬০ দিনের মধ্যে কারিগরি বিষয়গুলোতে সমঝোতায় পৌঁছানোর তৎপরতায় নেমেছেন। এসব বিষয়ের সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার বড় ধরনের প্রভাব জড়িয়ে আছে।
তবে স্মারক সইয়ের পর থেকে শুরু হওয়া দুই মাসের এই সময়সীমার প্রথম কয়েক দিন জটিল হয়ে ওঠে লেবাননে ইসরায়েল ও ইরানসমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে তীব্র পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে। এর সঙ্গে যোগ হয় ইরানের সামরিক বাহিনীর ঘোষণা, যেখানে বলা হয়- তারা হরমুজ প্রণালি ফের বন্ধ করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড ইরানের দাবির বিরোধিতা করে বলেছে, প্রণালিটি আবারও বন্ধ করে দেওয়ার দাবি সঠিক নয়। তারা জানিয়েছে, জলপথ দিয়ে চলাচল অব্যাহত আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ইরানি আলোচকদের সুইজারল্যান্ডে পৌঁছানোর কথা জানানোর পরপরই ভ্যান্স যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন। মূলত গত শুক্রবার লুসার্নের কাছে মনোরম বুর্গেনস্টক অবকাশকেন্দ্রে পৌঁছানোর কথা ছিল ভ্যান্সের। তবে লেবাননে লড়াই বেড়ে যাওয়া এবং ইরানি কর্মকর্তাদের আলোচনা অংশগ্রহণের পরিকল্পনা বাতিলের পর তিনি সফর স্থগিত করেন।
তেহরানের আলোচক দলের মধ্যে রয়েছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তাদের সঙ্গে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও তেল খাতের কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলে আছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। তারা এরইমধ্যে সুইজারল্যান্ডে পারমাণবিক আলোচনার কারিগরি বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই শুরু করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় অন্যতম মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরও অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। যুক্ত থাকবেন কাতারের মধ্যস্থতাকারীরাও।
ভ্যান্স বলেছেন, তিনি সুইজারল্যান্ডে কেবল ‘এক-দুই দিন’ থাকার পরিকল্পনা করেছেন। আলোচনার বিস্তারিত অংশের নেতৃত্ব মূলত উইটকফ ও কুশনারই দেবেন। তবে আলোচনায় ভ্যান্সের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদ শেষে ২০২৮ সালের নির্বাচনে ভ্যান্স প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছেন।
এদিকে ইরানের সঙ্গে চুক্তি নিয়েও নিজ দলের একাংশের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প ও ভ্যান্স। রিপাবলিকান কট্টরপন্থীরা চুক্তিটিকে ওবামা প্রশাসনের সময় সই হওয়া পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে নেতিবাচকভাবে তুলনা করছেন। ট্রাম্প ও রিপাবলিকান দল দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, ওই চুক্তি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রকৃত অর্থে বন্ধ করতে পারেনি।
ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সই করা চুক্তি তেহরানকে অবিলম্বে স্বাধীনভাবে তেল বিক্রির সুযোগ দেয়। একই সঙ্গে এটি ইরানের বর্তমানে জব্দ থাকা শত শত কোটি ডলারের সম্পদ ব্যবহারের পথ খুলে দেয়।
চুক্তিতে ইরানকে তার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হালকা করার কথাও বলা হয়েছে। ধারণা করা হয়, এই মজুত গত গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিচে পুঁতে রাখা আছে।
চুক্তি অনুযায়ী, বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ৬০ দিন কোনো অতিরিক্ত ফি ছাড়াই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে। তবে ভবিষ্যতে ইরানের পক্ষ থেকে কর আরোপের পথ সমঝোতা স্মারকে বন্ধ করা হয়নি।
শনিবার ট্রাম্প নিজেও হুমকি দিয়েছেন, ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজ প্রণালিতে ফি আরোপ করবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, এই অর্থ নেওয়া হবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য ‘অভিভাবক দেবদূত’ হিসেবে দেওয়া সেবার বিনিময়ে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকে ইরানি হামলা থেকে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ট্রাম্প।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়তাহু। তিনি কিংবা লেবাননের ইরান সমর্থিত সশস্ত্রগোষ্ঠী হিজবুল্লাহ কেউই চুক্তির সইকারী নন। অথচ সমঝোতা স্মারকে ইরান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে মধ্যপ্রাচ্যের সব ফ্রন্টে বিশেষ করে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।
অবশ্য নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েলের প্রতি যেকোনো হুমকি দূর না হওয়া পর্যন্ত তার বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান করবে। জবাবে হিজবুল্লাহ বলেছে, লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি না দিলে তারা হামলা বন্ধ করবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চুক্তির পর প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর লড়াইয়ে লেবাননে ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে চার ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়েছেন।


