৪৩৭, চতুর্থ ইনিংসে এত বড় লক্ষ্য তাড়া করার রেকর্ড প্রায় ১৫০ বছর বয়সী টেস্ট ক্রিকেটেই আর নেই। তাই বাংলাদেশের বিপক্ষে সিলেট টেস্ট জিতে, সিরিজ বাঁচাতে বিশ্ব রেকর্ড নতুন করে লিখতে হতো পাকিস্তানকে। মোহাম্মদ রিজওয়ান-সাজিদ খানের ৫৪ রানের জুটিতে বাংলাদেশের বুকে কাঁপন ধরিয়ে সেই পথে এগিয়েও যাচ্ছিল তারা।
কিন্তু বাঁধ সাধলেন তাইজুল ইসলাম, শেষ দিন সকালের সেশনে একাই নিলেন দুই উইকেট, ইনিংসে ৬টা। ৯৪ রানে শরীফুলের বলে আউট হন রিজওয়ান। ১ ঘণ্টা ৫ মিনিটের মাথায় ৩৫৮ রানে গুটিয়ে গেল পাকিস্তান। ৭৮ রানের এই জয়ে প্রথমবার পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ, তাও ২-০ ব্যবধানে বাংলাওয়াশ করে।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানকে টানা দুই টেস্ট সিরিজে হারালো বাংলাদেশ। এর আগে ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে এসেছিল ঐতিহাসিক সিরিজ জয়। সেবারও ২-০ ব্যবধানে পাকিস্তানকে হারিয়ে আসে টাইগাররা।
স্কোরবোর্ডে ৭ উইকেটে ৩১৬ রান নিয়ে পঞ্চম দিনের খেলা শুরু করা পাকিস্তান সুযোগ পেয়েছে শুরু থেকেই। বাংলাদেশের এলোমেলো ফিল্ডিং, দুই দফায় সাজিদ-রিজওয়ানের ক্যাচ উঠলেও সেসব তালুবন্দী করতে না পারার ব্যর্থতা পেয়ে বসেছিল তাদের। নাহিদ রানার বলে ৭৭ রানে গালিতে ক্যাচ তুলেছিলেন রিজওয়ান, মিরাজের হাত ফসকে বেরিয়ে যায় সেটা। ডানে ঝাঁপিয়েও ধরতে পারেননি।
তবে দ্বিতীয়বার যখন আবার একই জায়গায় ক্যাচ উঠে তার ব্যাট থেকে, তখন সেঞ্চুরি থেকে ৬ রান দূরে এই ডানহাতি ব্যাটার। মজার ব্যাপার, শরীফুলের বলে সেই গালি পজিশনেই ক্যাচ ধরেন মিরাজ। সেঞ্চুরি বঞ্চিত হওয়ার চেয়ে তখন ম্যাচ ফসকে যাওয়ার বেদনায় পুড়েছেন রিজওয়ান।
যদিও ৯৬-তম ওভারের আগে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত বিরতি পেয়ে যায় বাংলাদেশ, সম্ভবত পায়ে টান লাগাতে ফিজিও ডাকেন মিরাজ। সেই ড্রিংকস ব্রেকের পর তাইজুলের টার্ন করে বেরিয়ে যাওয়া বলে খোঁচা দিয়ে সাজিদ ফিরলে ভাঙে তার সাথে রিজওয়ানের ৫৪ রানের জুটি। শেষটাও হয়েছে তাইজুলের হাত ধরেই। লং অনে তাকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে তানজিদ তামিমের হাতে ক্যাচ দেন খুররম শাহজাদ। তার ৩৪.২-৪-১২০-৬ বোলং ফিগারে নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের জয়।
চতুর্থ দিনের ব্যাটে-বলের দারুণ লড়াই শেষে পাকিস্তানকে জয় থেকে ১২১ রান দূরে রেখে দিন শেষ করে বাংলাদেশ। যদিও টপ অর্ডারে ধসের পর ১৩৪ রানের জুটিতে শেষ সেশনে দাপট দেখিয়েছেন সালমান আলী আগা-মোহাম্মদ রিজওয়ান জুটি। বাংলাদেশের পেসার-স্পিনারদের এই দুই ব্যাটার যেভাবে সামলাচ্ছিলেন, তাতে একটা সময় অন্তত মনে হচ্ছিল পাকিস্তান কিছু একটা করে বসতে পারে। কারণ প্রথম পাঁচ ব্যাটারই ফেরেন ১৬২ রানের মধ্যে। চা-বিরতিতে যাওয়ার আগে বাংলাদেশ যেখানে দিন শেষ হওয়ার আগেই ম্যাচ জেতার স্বপ্ন দেখছিল, সেখানে বাধ সাধেন সালমান আলী-রিজওয়ান।
তবে সিলেটের শেষ বিকেলে টার্নিং উইকেটে ২২৪ বল দীর্ঘ সেই জুটি ভাঙেন তাইজুল ইসলাম, তাও নতুন বল হাতে সালমানকে বোল্ড করে। ১০২ বলে ৭১ রান করেন এই ডানহাতি ব্যাটার। দিনের শেষ দিকে তাইজুল ঝটকাটা দেন দুর্দান্ত এক টার্নিং ডেলিভারিতে হাসান আলীকে ফিরিয়ে।
এর আগে বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে চতুর্থ দিনের অষ্টম ওভারে প্রথম উইকেট হারায় পাকিস্তান। নাহিদের তুমুল গতির শর্ট লেন্থের বলে গালিতে মেহেদী হাসান মিরাজের হাতে ক্যাচ দেন ওপেনার আবদুল্লাহ ফজল। আরেক ওপেনার আজান আওয়াইসকে এলবিডব্লিউ করে দ্বিতীয় উইকেট নেন সেই মিরাজই।
এরপর তৃতীয় উইকেটে অধিনায়ক শানের সাথে ১১৫ বলে ৯২ রানের জুটি গড়েন আগের ইনিংসে ফিফটি করা বাবর। বড় হতে থাকা জুটি ভেঙেছেন তাইজুল। এই বাঁহাতি স্পিনারের করা লেগ স্টাম্পের বাইরে বেরিয়ে যেতে থাকা বলে ব্যাট ছুঁইয়ে বসেন বাবর, দারুন রিফ্লেক্সে ক্যাচ ধরেন লিটন দাস। ৫২ বলে ৪টি চার ও ১ ছক্কায় ৪৭ রান করেন এই ডানহাতি ব্যাটার।বাঁহাতি শানও ফিরেছেন তাইজুলের বলেই।
গুড লেন্থ থেকে লাফিয়ে ওঠা বলে শর্ট লেগে মাহমুদুল হাসান জয়ের হাতে ক্যাচ দেন ১১৬ বলে ৭১ রান করা পাকিস্তানি অধিনায়ক। এরপর দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে সৌদ শাকিলকে ফিরিয়েছেন নাহিদ রানা। সব মিলিয়ে মাত্র ২৯ রানের মধ্যে পড়ে ৩ উইকেট। মিডল অর্ডারের ধস সামলে ৩৮ রানের জুটিতে লড়ছেন শেষ স্বীকৃত দুই ব্যাটার সালমান আলী ও মোহাম্মদ রিজওয়ান।
এর আগে ৪৬ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করা বাংলাদেশ মুশফিকুর রহিমের রেকর্ড ১৪তম সেঞ্চুরিতে দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৯০ রানে থামে বাংলাদেশ। লিড দাঁড়ায় ৪৩৬। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করেন লিটন দাস, বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৭৮। জবাবে পাকিস্তান গুটিয়ে যায় ২৩২ রানে।


