রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার দরবারে পুলিশের ওপর হামলার মামলায় গ্রেপ্তার সাতজনের মধ্যে অন্তত দু’জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী; এমন তথ্য দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।
রোববার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ওই ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ‘সম্পৃক্ততার’ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
উপপ্রেস সচিব বলেন, ‘রাজবাড়ীতে গত শুক্রবার চারটি ঘটনা ঘটেছে—পুলিশ এবং প্রশাসনের গাড়ি ভাংচুর, মাজার ভাংচুর, কবর থেকে লাশ উত্তোলন এবং লাশ পুড়িয়ে ফেলা।’
‘এই চারটি ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে যিনি কবর থেকে লাশ উত্তোলন করেছেন, তার নাম কাজী অপু—তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া এই সাতজনের মধ্যে অন্তত দুজন রয়েছেন যারা স্থানীয় আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত,’ বলেন তিনি।

তাদের পরিচয় সম্পর্কে প্রেস সচিব আরও বলেন, ‘তাদের একজন হচ্ছেন হিরু মৃধা, সাধারণ সম্পাদক গোয়ালন্দ থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগ, এবং মাসুদ মৃধা, সভাপতি উজানচর ইউনিয়ন ছাত্রলীগ, গোয়ালন্দ থানা।’
ওই ঘটনার ভিডিও বিশ্লেষণ চলছে জানিয়ে আজাদ মজুমদার বলেন, ‘পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে যাদেরই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে বা যাদের সংশ্লিষ্টতা তদন্তে আসবে, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে।’
এর আগে, রোববার সকালে স্থানীয় পুলিশ ওই মামলায় পাঁচজন গ্রেপ্তারের খবর জানিয়েছিল। ওই মামলায় আসামি করা হয় অজ্ঞাতনামা তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার জনকে। হামলার রাতেই শুক্রবার থানার উপ-পরিদর্শক সেলিম মোল্লা বাদী হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট থানায় মামলাটি করেন।
গত শুক্রবার দুপুরে নুরাল পাগলার দরবারে হামলা চালায় বিক্ষুব্ধ জনতা। এসময় পুলিশ নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে এলে পুলিশের ওপর হামলা করে গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।
কেন নুরাল পাগলার দরবারে হামলা?
গোয়ালন্দের স্থানীয় সূত্র জানায়, পৌরসভার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলা বহু বছর আগে নিজ বাড়িতে গড়ে তোলেন দরবার শরীফ। আশির দশকের শেষের দিকে নিজেকে ‘ইমাম মাহদী’ দাবি করে আলোচনায় আসেন তিনি।
ওই সময়ে তার বিরুদ্ধে তীব্র জনরোষ তৈরি হয়। পরে ১৯৯৩ সালের ২৩ মার্চ জনরোষ এড়াতে তিনি মুচলেকা দিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন। এর কিছুদিন পর তিনি আবার ফিরে এসে তার দরবার শরীফের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন।
গত ২৩ আগস্ট ভোরে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুরাল পাগলা। পরে ওইদিনই সন্ধ্যায় এলাকাবাসীর অংশগ্রহণে তার প্রথম জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয় এবং পরে তার ভক্তানুরাগীদের অংশগ্রহণের দরবার শরীফের ভেতরে দ্বিতীয় জানাজা নামাজ শেষে রাত ১০ টার দিকে তাকে মাটি থেকে প্রায় ১২ ফুট উঁচু স্থানে বিশেষ কায়দায় দাফন করা হয়। পবিত্র কাবা শরীফের আদলে তার কবরের রং করা হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে ফুঁসে ওঠেন বিক্ষুব্ধ জনতা। তাদের আন্দোলনের ফলে কবরের রং পরিবর্তন করা হয়।
এ বিষয় নিয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফায় বৈঠক হয় বিক্ষুব্ধ জনতা ও নুরাল পাগলার পরিবারের সদস্যদের। এরপরেও কবর নিচে নামাতে গড়িমসি করে নুরাল পাগলার পরিবারের সদস্যরা।
পরে এ বিষয়ে দুই দফা সংবাদ সম্মেলন করে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন বিক্ষুব্ধ জনতা। কবর নিচে নামানো না হলে কবর ভেঙে ফেলার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
তারই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার জুম্মার পর গোয়ালন্দ আনসার ক্লাব মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। বিক্ষোভ থেকে হামলা চালানো হয় নুরাল পাগলার দরবারে। পাল্টা আক্রমণ করেন নুরাল পাগলার ভক্তরা। ইট-পাটকেল নিক্ষেপসহ তুমুল সংঘর্ষে দুই পক্ষের শতাধিক মানুষ আহত হন। এক পর্যায়ে নুরাল পাগলার দরবারে ঢুকে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। পরে নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে গোয়ালন্দ পদ্মার মোড়ে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ওপর নিয়ে পুড়িয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা।


