দেশে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ মেয়ে এখনও বাল্যবিয়ের শিকার। ইউনিসেফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার যৌথ পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে। রোববার মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে- ২০২৫ (এমআইসিএস) বা বহুমাত্রিক সুচক জরিপের প্রতিবেদনে প্রাথমিক ওই ফল প্রকাশ করেছে প্রকাশ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশে গত ছয় বছরে বাল্যবিয়ের পরিমাণ হ্রাস পেলেও মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি দেখা যায়নি। এমআইসিএস জরিপে মূলত দেশের শিশু ও নারীদের শিক্ষা, চিকিৎসা, মানবাধিকারসহ বিভিন্ন খাতের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়।
২০১৯ সালের এমআইসিএস জরিপ অনুযায়ী, ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ মেয়ে ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে এবং ঝুঁকিপূর্ণ মাতৃত্বের স্বাদ নিতে বাধ্য হয়।
ইউনিসেফের সবশেষ জরিপে এই হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশে। অর্থাৎ এখনও প্রায় অর্ধেক মেয়েকেই ১৮ বছরের আগে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
যা ভুক্তভোগী মেয়ে শিশুদের ওপর মানসিক চাপ তৈরির পাশাপাশি কম বয়সে সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে মা এবং শিশু দুজনের জন্যই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, কম বয়সে বিয়ে হওয়া মেয়েদের রক্তস্বল্পতা, অপুষ্টি ও গর্ভাবস্থাজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তাদের সন্তানরাও কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া, ঘন ঘন অসুস্থ হওয়া বা পাঁচ বছরের আগেই মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকে।
এমআইসিএস ২০২৫-এর ফলেও এসব ঝুঁকি ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গর্ভবতী নারীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতার হার ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং প্রতি ছয় শিশুর মধ্যে অন্তত একটি শিশু জন্মের সময় কম ওজন নিয়ে জন্মায়, যার হার ১৬ শতাংশ।
এছাড়া প্রতি এক হাজার নবজাতকের মধ্যে গড়ে ২২ শিশুর মৃত্যু ঘটে। পাশাপাশি মায়েদের অপুষ্টি, ওজনহ্রাস স্তন্যদানের ক্ষেত্রেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
বাল্যবিয়ে কমার হার খুব ধীরগতির হলেও, জরিপে নারীদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে জরিপে।
৮৯ দশমিক ৭ শতাংশ মা গর্ভকালীন সেবা পাচ্ছেন। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ শতাংশে, এবং দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে প্রসব ৭৭ দশমিক ৬ শতাংশ। শিশুদের খর্বতা (স্টান্টিং বা বয়স অনুযায়ী উচ্চতা না বাড়া) ২৮ শতাংশ থেকে ২৪ শতাংশে নেমেছে।
স্বাস্থ্যসেবায় উন্নতি হলেও এখনও মাত্রাতিরিক্ত বাল্যবিয়ের পেছনে সামাজিক রীতি, দারিদ্র্য এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যুগ যুগ ধরে চলা আসা ভ্রান্ত ধারণাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, এ অবস্থা বদলাতে হলে জনসচেতনা বৃদ্ধি, আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে আরও কঠোরতা অবলম্বনের পাশাপাশি নারী শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সেইসঙ্গে আর্থিক অবস্থা কিংবা অন্য কোনো জতিলতায় যেসব পরিবার মেয়ে শিশুদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে তাদের লক্ষ্য করে বিশেষ সহায়তা ও প্রণোদনা নিশ্চিত করারও পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।


