নায়ক’ ও ‘হিরো’ শব্দ দুটো আমরা সিনেমা-নাটকের চরিত্রে বন্দী করেছি। এই বন্দিদশা থেকে শব্দ দুটিকে মুক্ত করা প্রয়োজন। পর্দায় যারা অভিনয় করেন, তারা অভিনেতা ও অভিনেত্রী। চরিত্রের গুরুত্ব অনুযায়ী তারা প্রধান বা পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেন। শাকিব খান ও সালমান খান মূলত অভিনেতা, নায়ক নন। অভিনেতাকে ‘নায়ক’ বা ‘হিরো’ না বলে ‘প্রধান চরিত্রের অভিনেতা’ বলা যুক্তিসংগত। আমরা ভুল করে অভিনেতাদের আভিধানিক মর্যাদা দিয়েছি। এই ভুল ভাঙতে হবে।
শব্দ দুটোর প্রকৃত অর্থ খুঁজলে দেখা যায়, ‘নায়ক’ শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নেতৃত্ব, সাহস ও আদর্শ। ‘হিরো’ শব্দটির অর্থ বীরত্ব ও অসাধারণ কর্ম। গ্রিক পুরাণে হিরোরা সমাজ বদলে দিতেন। সিনেমার চরিত্রগুলো লেখকের কল্পনা মাত্র। তারা মুখস্থ সংলাপ বলেন। তাদের কাজের সঙ্গে বাস্তবের বীরত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। অভিনেতাকে নায়ক বানিয়ে আমরা শব্দটির মর্যাদা কমিয়ে বিনোদনের বস্তু করেছি। নায়কিত্ব হলো জীবন-মৃত্যুর লড়াই ও ব্যক্তিগত ত্যাগ। সিনেমার চরিত্র পর্দায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেও বাস্তবে ওই অভিনেতা দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়াই করেন?
বাস্তবের নায়করা আড়ালে থাকেন। বন্যায় মানুষ বাঁচাতে গিয়ে যে যুবক প্রাণ হারায়, সে নায়ক। যে শিক্ষক বিনামূল্যে শিশুদের পড়ান, সে নায়ক। মহামারিতে জীবন ঝুঁকিতে ফেলে যে চিকিৎসক রোগী সুস্থ করেন, তিনি হিরো। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সাধারণ মানুষই আসল নায়ক। তাদের নাম সিনেমার পোস্টারে থাকে না। তারা প্রচারের জন্য কাজ করেন না, দায়িত্ববোধ থেকে করেন।
সমাজ টিকে আছে এই অদেখা নায়কদের কারণে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া লাখ লাখ সাধারণ মানুষ ছিলেন আসল হিরো। তারা কোনো চরিত্রে অভিনয় করেননি, মৃত্যুকে বুকে টেনে নিয়েছেন। তাদের অনেকের নাম ইতিহাসের পাতায় নেই, তবু তারাই প্রকৃত হিরো।
সাহিত্যে নায়ক ছিলেন গুণবান, সৎ ও আদর্শ চরিত্র। তিনি দুষ্টের দমন করতেন। সিনেমার তথাকথিত নায়ককে নাচতে, গাইতে ও প্রেমে পড়তে দেখি। অনেক সময় পর্দায় অশ্লীলতাও ফুটিয়ে তোলা হয়। একে আদর্শ বলা যায় না। অনেকে বলেন, অভিনেতা তো নায়ক চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলেন। এই যুক্তি দুর্বল। অভিনেতা চরিত্রের বাহক ও একজন শিল্পী মাত্র। ব্রিটিশ অভিনেতা পিটার সেলারস কমিক, ভিলেন ও প্রেমিকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাকে আমরা সব চরিত্রে নায়ক বলতে পারি না।
সিনেমা একটি ব্যবসা। ‘নায়ক’ ও ‘হিরো’ শব্দ দুটো বিপণনের হাতিয়ার। দর্শক পর্দায় আদর্শের প্রতিচ্ছবি খোঁজে। প্রযোজকরা ওই চাহিদা পুঁজি করে শব্দ দুটো ব্যবহার করেন। এতে শব্দ দুটোর আসল অর্থ হারিয়ে গেছে। পর্দায় যে অ্যাকশন দেখা যায়, তা ভান মাত্র। বাস্তবের সংগ্রাম ক্লান্তিকর ও কষ্টকর। সিনেমার চরিত্র এক নিমিষেই সমস্যা সমাধান করে, বাস্তবের নায়ক বছরের পর বছর লড়াই করেন।
শব্দ দুটিকে মুক্ত করলে বড় পরিবর্তন আসবে। অভিনেতা বাড়তি চাপ থেকে স্বস্তি পাবেন। তিনি শুধু অভিনয়ে মনোযোগ দিতে পারবেন। দর্শক বাস্তবের নায়কদের চিনতে শিখবেন। ভাষার যথার্থতা ফিরে আসবে। বীরত্ব, ত্যাগ ও সাহসের গুণগুলো শব্দের আসল মর্যাদা ফিরিয়ে দেবে।
বাস্তবের নায়কদের আমরা পদক দিই না, তাদের নিয়ে বায়োপিক ও গান তৈরি হয় না। তাদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়াই বড় সম্মান। তাদের গল্প ছড়িয়ে দিয়ে নতুন অনুপ্রেরণা তৈরি করা সম্ভব। সিনেমা অনেক সময় বাস্তব থেকে অনুপ্রেরণা নেয়। ভালো সিনেমা সমাজ বদলে ভূমিকা রাখলে তার কৃতিত্ব বাস্তবের মানুষের। পর্দার নায়কের গল্প কোনো না কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই আসে।
এই পরিবর্তন আনা খুব সহজ। সিনেমার অভিনেতাদের আমরা ‘অভিনেতা’ ও ‘প্রধান চরিত্রের অভিনেতা’ বলব। ‘নায়ক’ ও ‘হিরো’ শব্দ দুটো তোলা থাকবে কেবল বাস্তবের সাহসী মানুষদের জন্য। সংবাদপত্রে কোনো সাহসী কাজের খবর এলে আমরা ওই ব্যক্তিকে নায়ক বলব।
যারা আসল নায়ক খুঁজছেন, তারা চারপাশে তাকান। যারা ভয় না পেয়ে সত্য বলেন, বিপদে এগিয়ে আসেন ও সমাজের অন্ধকার দূর করতে চান, তারাই নায়ক। তারা প্রচার চান না, কাজই তাদের পরিচয়।
ভক্তরা অভিনেতাদের নায়ক মানতে পারেন। ভক্তি আর শব্দের সঠিক ব্যবহার আলাদা বিষয়। ভক্তির কারণে শব্দের অর্থ বিকৃত করা ঠিক নয়। তাদের ‘প্রিয় অভিনেতা’ বললে সম্মান কমে না। বরং পেশার প্রতি মর্যাদা বাড়ে। তারা অভিনয় দিয়ে মানুষকে আনন্দ ও চিন্তা দেন। এটাই তাদের বড় পরিচয়।
‘নায়ক’ বা ‘হিরো’ শব্দ দুটোকে সিনেমার জেল থেকে বের করে বাস্তবের মাঠে নিয়ে আসতে হবে। সেখানে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ, সংগ্রাম ও ত্যাগ চলছে। পর্দার আলো বিভ্রম তৈরি করে, বাস্তবের রোদ সত্য প্রকাশ করে। ভাষার প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে এখন থেকে অভিনেতাকে অভিনেতা বলি। যারা জীবন বদলে দেন, তারাই হোন আমাদের আসল নায়ক।
লেখক: সহসম্পাদক, টাইমস অব বাংলাদেশ


