গাইবান্ধার তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়া নদীর পানি কখনো কমছে আবার বাড়ছে। পানি ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে নদী তীরবর্তী এলাকা ও চরাঞ্চলে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলমান বন্যায় জেলার সাত উপজেলায় প্রায় ১১৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে আউশ ৪৫, পাট ৩০, তিল ২৫, আমন বীজতলা ৮ ও শাকসবজি ১০ হেক্টর।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিকাল ৩টা থেকে মঙ্গলবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ৪৩ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে ১৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৭০ সেন্টিমিটার নিচে, ঘাঘট নদীর পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১৩০ সেন্টিমিটার নিচে এবং গোবিন্দগঞ্জের করতোয়া নদীর পানি চকরহিমাপুর স্টেশন পয়েন্টে ৫৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩৫৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চলমান মৌসুমে এখন পর্যন্ত জেলার কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।
পাউবো ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পানি বৃদ্ধি ও কমার মধ্যে জেলার চার উপজেলার অন্তত ২৫টি পয়েন্টে ভাঙন চলছে। সদর, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ি উপজেলায় গত কয়েক দিনে পাহাড়ি ঢলে তীব্র ভাঙনে নদী তীরবর্তী অন্তত আট শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বিপুল পরিমাণ আবাদী জমি।
তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নের চৌমহন চর, খাটিয়ামারি ও কাউয়াবাদা এলাকা। ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে ইতোমধ্যে এসব এলাকার অন্তত সাড়ে তিন শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কয়েক শত বিঘা আবাদি জমি ও বিপুল সংখ্যাক গাছপালা।
এ ছাড়া ভাঙনের শিকার হয়েছে কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের বালাসীঘাট, রসুলপুর এবং উড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুর এলাকা।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপসিয়া ইউনিয়নের লাল চামার কেরানীর চর এলাকায় অন্তত দুই শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে এবং শতাধিকের বেশি বিঘা ফসলি জমি বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া ভাঙনের শিকার হয়েছে কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের কালির খামার গ্রামের শখের বাজার, হরিপুর ইউনিয়নের চর চরিতাবাড়ী, রাঘব, চন্ডিপুর ইউনিয়নের উত্তর সীচা, কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার, কেরানির চর, মিন্টু মিয়ার চর ও বাদামের চর এলাকা।
সদর উপজেলার মোল্লাচর ইউনিয়নের চিথতুলিয়া দিগর গ্রামের কৃষক আশরাফ জানান, রাতে রাতে পানি বৃদ্ধির কারণে তার তিন বিঘা জমির আউশ ধান তলিয়ে গেছে। সিধাইল গ্রামের রিপন মিয়া জানান, ভাঙনের কারণে ২০টির বেশি পরিবার সেখান থেকে সরে গেছে এবং আরও অনেক পরিবার ভাঙনের মুখে রয়েছে।
সুন্দরগঞ্জের কালিরখামার গ্রামের কৃষক তোফেজ্জল ইসলাম জানান, বন্যার কারণে তার দুই বিঘা জমির পাট গাছ পানির নিচে গিয়ে পচন ধরছে। কৃষক আঙ্গুর মিয়া জানান, হঠাৎ ভারত থেকে পানি ছাড়ার কারণে নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তার এক বিঘা জমি তিলসহ নদীতে ভেঙে পড়েছে। ফুলছড়ির রসুলপুর গ্রামের আয়নুল মিয়া সবজির জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার কথা জানিয়ে দ্রুত ভাঙন রোধের দাবি জানান।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, মাঠপর্যায়ের হিসাব অনুযায়ী জেলায় ১১৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। বন্যার পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে এই তালিকা আরও বাড়বে।
গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘পানি বৃদ্ধির প্রভাবে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, তিস্তা ও ঘাঘটের অন্তত ২৫টি পয়েন্টে ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে জিওব্যাগসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ায় চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’


