দীর্ঘ ১৭ বছর ৩ মাসের নির্বাসিত জীবন শেষ করে যুক্তরাজ্য থেকে আজ দেশে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দেশের বর্তমান নাজুক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার এই প্রত্যাবর্তনকে কেবল বিএনপির জন্য নয়, বরং গোটা বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে যখন বিশৃঙ্খলা আর প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে, ঠিক তখনই তারেক রহমানের এই ফেরা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক শূন্যতার মাঝে তার প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ জনমনে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি এখন দেশের বৃহত্তম সক্রিয় রাজনৈতিক দল। এই অবস্থায় তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও অনিয়ম কঠোর হাতে দমন করা।
খালেদা জিয়ার দীর্ঘ কারাবাস ও অসুস্থতা এবং তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে দলে যে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়েছিল, তার দেশে ফেরার মাধ্যমে সেই অভাব পূরণ হবে বলে মনে করছেন দলটির সিনিয়র নেতারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের দায়িত্ব কেবল দল পুনর্গঠনেই সীমাবদ্ধ নয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের অস্থিরতা কমিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনতে তিনি গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবেন বলে অনেকেই আশা করছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক প্রধান দিলারা চৌধুরী বলেন, বর্তমানে দেশে নেতৃত্বের যে শূন্যতা রয়েছে, তাতে তারেক রহমানের ফেরা ইতিবাচক। তিনি যদি জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন এবং দলকে সুশৃঙ্খল করতে পারেন, তবে তিনি একজন সার্থক জাতীয় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবেন। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে তাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক নূরুল আমিন বেপারী মনে করেন, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা বয়ে আনবে। তার মতে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি যদি সরকার গঠন করে, তবে বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে এজন্য তারেক রহমানকে দূরদর্শী ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয় দিতে হবে। এ ছাড়া শেখ হাসিনার পতনের পর শক্তিশালী হয়ে ওঠা জামায়াতে ইসলামীকে সামলানোও তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে। ২০০২ সালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হওয়ার পর তিনি পাদপ্রদীপে চলে আসেন। হাওয়া ভবন নিয়ে নানা সমালোচনা থাকলেও সেই সময় তিনি দলের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন।
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হন। ২০০৮ সালে জামিনে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য সপরিবারে লন্ডন যান এবং সেখানে থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবরণ করলে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তার দেশে ফেরার আইনি বাধাগুলো কাটতে শুরু করে। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও আওয়ামী লীগ তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা থেকে আদালতে খালাস পান তিনি।
আমলে অন্তর্বর্তী সরকার তাকে দেশে ফেরার সুযোগ করে দেয়। বিএনপি তারেক রহমানকে বরণ করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে জনসভাস্থল পর্যন্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে স্বেচ্ছাসেবক টিম কাজ করছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর পূর্বাচলে ৩০০ ফিট এলাকায় এক বিশাল জনসভায় তার যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে গত বুধবার থেকেই সারা দেশ থেকে নেতাকর্মীরা ঢাকায় জড়ো হতে শুরু করেছেন।
বিএনপি নেতাদের প্রত্যাশা, আজকের এই জনসভায় ৫০ লাখেরও বেশি মানুষের সমাগম ঘটবে। তারেক রহমান যদি দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে দেশকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে নিয়ে যেতে পারেন, তবে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করতে পারবেন।


