চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) চলমান আন্দোলনের কারণে ব্যাহত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রম। প্রায় ৬ হাজার ৩৬৭ শিক্ষার্থী ও ৩৬১ শিক্ষক নিয়ে পাঁচটি অনুষদ ও ১৮টি বিভাগের এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধ রয়েছে ক্লাস ও পরীক্ষা।
এরই মধ্যে বিভিন্ন বিভাগের পরীক্ষা পিছিয়ে গেছে। এতে একদিকে একাডেমিক ক্যালেন্ডার পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে পরীক্ষা, থিসিস ও গবেষণার কাজ নিয়েও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শিক্ষার্থীরা।
পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জাহিরুল ইসলাম রতিন টাইমসকে বলেন, তাদের বিভাগ এমনিতেই অন্যান্য বিভাগের তুলনায় একাডেমিক ক্যালেন্ডারে কয়েক সপ্তাহ পিছিয়ে আছে। ২৩ ব্যাচের অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা লেভেল-২, টার্ম-২-এর পরীক্ষা শেষ করলেও তারা এখনো পরীক্ষায় বসতে পারেননি। তাদের পরীক্ষা শুরুর ঠিক দুই দিন আগে উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের পর ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি বদলে যায়। শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিল ছেড়ে আন্দোলনে যুক্ত হন, যার প্রভাব তাদের একাডেমিক কার্যক্রমেও পড়েছে। দায়িত্বশীলদের সিদ্ধান্তের কারণে তাদের একাডেমিক জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। দ্রুত পরিস্থিতির সমাধান করে স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রমে ফিরে যেতে চান তারা।
তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী প্রান্ত নাথ বলেন, গত ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে তাদের ডিএল শুরু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৪ সেপ্টেম্বর ও ১ অক্টোবর দুটি পরীক্ষা হওয়ার পর পূজার ছুটির আগে আরও চারটি এবং ছুটির পরে একটি পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। এরপর ডিসেম্বরেই চতুর্থ বর্ষের ক্লাস শুরু করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। বুয়েট, রুয়েট ও কুয়েটে থাকা একই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের তুলনায় তারা একাডেমিকভাবে এগিয়ে ছিলেন এবং অন্যদের আগেই বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ করার বিষয়ে আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু প্রথম পরীক্ষার মাত্র দুই দিন আগে উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের পর সেই পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে গেছে।
প্রান্ত নাথ বলেন, ‘আমাদের পরীক্ষা হবে কি না, পরীক্ষা হলেও কোন পরীক্ষা কখন হবে–সেটাও জানি না। পরীক্ষা সামনে রেখে প্রস্তুতি নেওয়ার পর মাঝপথে সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক পড়াশোনার গতিও ব্যাহত হচ্ছে। চলমান পরিস্থিতির কারণে সেটাও আমরা মেনে নিয়েছি।’
বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সামিহা ফাতেমা বলেন, তারা একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী একাডেমিক কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছিলেন। একটি পরীক্ষার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়ার পর এখন সেটি কবে হবে, তা নিশ্চিত নয়। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়াশোনায় ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারছেন না তারা। সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছেন বলে জানান তিনি।
শুধু ক্লাস ও পরীক্ষা নয়, থিসিস ও গবেষণার কাজ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাবিহা শবনম বলেন, তাদের একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অনেকের থিসিসের কাজও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে ওয়েট-ল্যাবভিত্তিক গবেষণায় দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে প্রস্তুত করা নমুনা নির্দিষ্ট পরিবেশে সংরক্ষণ করতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব না হলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে অনেক শিক্ষার্থীকে গবেষণার কাজ আবার শুরু থেকে করতে হতে পারে, যা সময় ও অর্থ–দুইয়েরই অপচয় ঘটাবে। দ্রুত স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রম ও গবেষণার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দাবি মেনে নিয়ে সায়েম স্যারকে পুনরায় উপাচার্য পদে বহাল করা হোক। দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। তবে আমরা দ্রুত আমাদের ক্লাস ও গবেষণার কাজে ফিরতে চাই।’
ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা
আন্দোলন শেষ হওয়ার পর একাডেমিক ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন চুয়েটের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. মঈনুল ইসলাম। তিনি টাইমসকে বলেন, আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে একাডেমিক ক্ষতি পুরোপুরি শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব না হলেও তা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বেশ কিছু জায়গায় ছুটি আছে। এগুলো আমরা সমন্বয় করতে পারি। যেমন শীতকালীন ছুটি এবং রমজানে অনেক দিন ছুটি থাকে। প্রয়োজন হলে রমজানের ২০ বা ২১ তারিখ পর্যন্ত ক্লাস করা যেতে পারে। এ ছাড়া শনিবারেও ক্লাস নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে, যদি আন্দোলন দীর্ঘায়িত হয়।’ পরীক্ষার মধ্যকার বিরতিও কমিয়ে আনা যেতে পারে। প্রয়োজনে পরীক্ষার ব্যবধান পাঁচ দিনে নামিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে না বলে জানান তিনি। তবে সবকিছু শিক্ষার্থীরা কতটা চাপ সহনীয় পর্যায়ে নিতে পারবে, সেটিও বিবেচনায় রাখা হবে।
চলমান আন্দোলনে ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার পাশাপাশি থিসিস ও গবেষণার কাজেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর স্থগিত একাডেমিক কার্যক্রম কত দ্রুত সমন্বয় করা যায় এবং পিছিয়ে পড়া একাডেমিক ক্যালেন্ডার কতটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়, এখন সেটিই সংশ্লিষ্টদের জন্য বড় বিষয়।
এর আগে, গত ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে ওই রাত থেকেই আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। পরদিন থেকে শুরু হয় সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি, যা এখনো অব্যাহত আছে।


