আধুনিকতার চাকচিক্যের আড়ালে গ্রামীণ নরসুন্দরদের নীরব হাহাকার

আধুনিকতার চাকচিক্যের আড়ালে গ্রামীণ নরসুন্দরদের নীরব হাহাকার
কাঁচি-ক্ষুর হাতে গ্রামীণ নরসুন্দর। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

কোথাও ঝকঝকে আয়না, আরামদায়ক চেয়ার, আধুনিক হেয়ার কাটিংয়ের সরঞ্জাম, ওয়াইফাই আর নানা ধরনের প্রসাধনীর সমাহার। আবার কোথাও কাঠের বেঞ্চ, পুরোনো কাঁচি, ক্ষুর আর ছোট্ট একটি আয়না-এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ নরসুন্দরদের জীবন।

কাঁচির কচ্ কচ্ শব্দে যাদের জীবনের চার-পাঁচ দশক কেটে গেছে, তাদের অনেকের দিন এখন কাটে হিসাব কষে–একদিনে কয়জনের চুল কাটলেন, কয়জনের দাড়ি শেভ করলেন, আর দিনের শেষে হাতে উঠল কত টাকা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেখানে সংসারের ব্যয় বাড়ছে, সেখানে গ্রামীণ নরসুন্দরদের সেবামূল্য রয়ে গেছে আগের মতোই।

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জসহ বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জীবনে তাই এক ধরনের নীরব অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে। আধুনিক সেলুনের বিস্তার, মানুষের পরিবর্তিত রুচি, নতুন প্রজন্মের আধুনিক সেবার প্রতি আগ্রহ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে ঐতিহ্যবাহী এই পেশা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

রায়গঞ্জ উপজেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া গ্রামের শ্রী সুশান্ত শীল। বাবা মৃত পণ্য চন্দ্র শীলের হাত ধরে প্রায় ৪০ থেকে ৪২ বছর আগে হাতে নিয়েছিলেন কাঁচি ও ক্ষুর। এরপর কেটে গেছে জীবনের দীর্ঘ সময়। মানুষের চুল কাটা, দাড়ি শেভ করা আর পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে কাজ করাই হয়ে উঠেছে তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন।

বর্তমানে সদর উপজেলার বহুলী ইউনিয়নের ডুমুর ইচ্ছা গ্রামের হাটখোলায় বসে কাজ করেন তিনি। তার নির্ধারিত সেবামূল্য শুনলে বর্তমান বাজারব্যবস্থার সঙ্গে তার জীবনের বৈপরীত্যটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজনের চুল কাটতে তিনি নেন ৩০ টাকা। চুল ও দাড়ি কাটলে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। শিশুদের চুল কাটতে ৩০ টাকা। আর দাড়ি শেভ-মাত্র ১০ থেকে ১৫ টাকা।

অর্থাৎ একজন মানুষের দাড়ি শেভ করে যে টাকা আয় হয়, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সামান্য অংশও কেনা বেশ কঠিন।

সুশান্তের জীবনে তাই বাজারের এই একমাত্র দোকানই শেষ ভরসা নয়। তার পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে কাজ করতে হয়। কৃষিকাজেও যুক্ত হতে হয় বাড়তি আয়ের আশায়। জীবিকার এই বহুমুখী সংগ্রামই বলে দেয়, শুধু নরসুন্দরের কাজের আয় দিয়ে সংসার চালানো কতটা কঠিন হয়ে উঠেছে।

গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তনের মাঝেও কোথাও কোথাও টিকে আছে নরসুন্দরদের সঙ্গে পরিবারের পুরোনো লেনদেনের রীতি। সারা বছর একটি পরিবারের সদস্যদের চুল কাটা ও দাড়ি শেভ করার বিনিময়ে বছর শেষে নরসুন্দরকে দেওয়া হয় ধান। স্থানীয়ভাবে এই প্রথাকে বলা হয় ‘ধানের জমা’। একসময় এই ব্যবস্থা ছিল নরসুন্দরদের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখন সেটিও অনেকটা টিকে আছে ঐতিহ্যের স্মৃতি হয়ে। ধানের এই বিনিময় পদ্ধতি একদিকে যেমন গ্রামীণ অর্থনীতির পুরোনো চিত্র তুলে ধরে, অন্যদিকে আধুনিক নগদ অর্থনীতির বাস্তবতায় নরসুন্দরদের অবস্থানটিও স্পষ্ট করে।

সুশান্ত শীলের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। এক ছেলে ও এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। দীর্ঘ কর্মজীবনের পরও থামেনি তার কাঁচি-ক্ষুরের ব্যবহার। বয়স বাড়ছে, কিন্তু সংসারের প্রয়োজন কমছে না।

শুধু সুশান্ত নন, একই গ্রামের শ্রী বিমল চন্দ্র শীলও দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তার বাবা মৃত গুপিবল্লভ শীল। তিন ছেলে ও এক মেয়ের বাবা বিমল। মেয়ের বিয়ে হয়েছে ঢাকায়। বয়স বাড়লেও জীবিকার প্রয়োজনে এখনও মানুষের চুল-দাড়ি কাটছেন তিনি।

প্রায় ৬০ বছর ধরে মানুষের চুল ও দাড়ি কাটছেন তিনি। একজন মানুষের কর্মজীবনের ছয়টি দশক যদি একই কাঁচি ও ক্ষুরের সঙ্গে কেটে যায়, তাহলে সেই সরঞ্জাম শুধু জীবিকার উপকরণ থাকে না-তা হয়ে ওঠে জীবনেরই অংশ। পেশা বদলের সুযোগ বা অবসর নেওয়ার মতো আর্থিক নিরাপত্তা না থাকায় বয়সের ভার সত্ত্বেও এখনও তাকে কাঁচি-ক্ষুর হাতে বসতে হয়।

আরও পড়ুন

একদিকে আধুনিক সেলুন, অন্যদিকে টিকে থাকার লড়াই

সময়ের সঙ্গে মানুষের চাহিদা বদলেছে। শহর কিংবা জনবহুল এলাকার সেলুনগুলো এখন শুধু চুল কাটা বা শেভ করার জায়গা নয় হয়ে উঠেছে আধুনিক সৌন্দর্যচর্চার কেন্দ্র।

সরদারপাড়া এলাকার সেলুন ব্যবসায়ী হাসমত জানান, কান্দাপাড়া এলাকায় তার দোকানে গ্রাহকদের ভিড় থাকে। সেলুনে রয়েছে ওয়াইফাই সুবিধাসহ বিভিন্ন আধুনিক সেবা। সেখানে চুল কাটার জন্য নেওয়া হয় ৫০ থেকে ১০০ টাকা। সাধারণ শেভ ৩০ থেকে ৪০ টাকা। ফোম শেভ, কলপ দেওয়া ও মেসেজের মতো অতিরিক্ত সেবার জন্য নেওয়া হয় ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত।

গ্রাহকরা আধুনিক পরিবেশ ও বাড়তি সেবার দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। ফলে একদিকে আধুনিক সেলুনে বাড়ছে সেবার বৈচিত্র্য, অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ নরসুন্দরদের সামনে দেখা দিচ্ছে গ্রাহক সংকট।

এখানেই তৈরি হচ্ছে বৈষম্যের আরেকটি চিত্র–একই পেশার দুই প্রান্তে সেবামূল্য ও ব্যবসার পরিবেশের এতটা পার্থক্য।

নরসুন্দরদের ভাষ্য, কাঁচি, ক্ষুর, ব্লেডসহ কাজের সরঞ্জামের দাম বেড়েছে। বেড়েছে দোকানের খরচ ও ব্যক্তিগত জীবনের ব্যয়ও। কিন্তু গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত সেবামূল্য এক লাফে বাড়ানো সম্ভব নয়। কারণ, গ্রামীণ ক্রেতাদের বড় একটি অংশ এখনও কম খরচে সেবা নেওয়ার ওপর নির্ভরশীল।

ফলে নরসুন্দররা ‘কম আয়-কম সেবামূল্য-উচ্চ ব্যয়ে’র মতো এক ধরনের চক্রের মধ্যে আটকে আছেন। একদিকে চুল কাটার দাম ৩০ টাকা কিংবা শেভের দাম ১০-১৫ টাকা; অন্যদিকে চাল, ডাল, তেল, পোশাক, চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই হিসাবের ভারসাম্য মেলানোই তাদের কাছে বড় সংকট।

ছবি: টাইমস

 

শীত ও বর্ষায় এই সংকট আরও তীব্র হয়। আবহাওয়ার কারণে মানুষের চলাচল কমলে গ্রাহকও কমে যায়। কমতে থাকে দিনের আয়। কিন্তু সংসারের খরচ থেমে থাকে না।

নরসুন্দরদের অনেকেই এই পেশার পাশাপাশি কৃষিকাজ বা অন্যান্য শ্রমের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। কেউ পাড়ায় পাড়ায় ঘুরছেন, কেউ ধানের জমা নিচ্ছেন, কেউ আবার অন্যের জমিতে কাজ করছেন। তবুও বড় ধরনের অসুস্থতা, সন্তানের পড়াশোনা, মেয়ের বিয়ে কিংবা পরিবারের জরুরি প্রয়োজনে হঠাৎ বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হলে তাদের অনেকেই আর্থিক সংকটে পড়েন। অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসা কিংবা পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে ওঠে অনেকের জন্য।

এখানে সংকট শুধু একটি পেশার নয়, সংকট তাদের সামাজিক নিরাপত্তারও। একসময় গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনে নরসুন্দর ছিলেন অপরিহার্য এক চরিত্র। বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান, পারিবারিক আয়োজন কিংবা নিয়মিত পরিচর্যা–সবকিছুর সঙ্গেই তাদের নিবিড় সম্পর্ক ছিল।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে চুল কাটা, দাড়ি শেভ করা কিংবা বছর শেষে ধান নেওয়ার রীতির মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল এক ধরনের গ্রামীণ সামাজিক-অর্থনৈতিক সম্পর্ক। কিন্তু আধুনিক সেলুন, নগরায়ণ এবং পরিবর্তিত জীবনযাত্রা সেই সম্পর্ককে ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে।

ফলে আজকের সুশান্ত, বিমলদের হাতে থাকা কাঁচি-ক্ষুর শুধু একটি পেশার অস্তিত্বের কথাই বলে না, বলে দেয় হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ সমাজব্যবস্থারও একটি অধ্যায়ের কথা।

নরসুন্দরদের দাবি, পেশাটিকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আধুনিক প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, উন্নত সরঞ্জাম সরবরাহ এবং সরকারি-বেসরকারি সহায়তা। একই সঙ্গে আধুনিক সেলুন ব্যবস্থাপনা, নতুন হেয়ার কাটিং ও সৌন্দর্যসেবার প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে তারাও সময়ের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

কারণ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে শুধু একটি পেশাই হারাবে না–হারিয়ে যাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি গ্রামীণ ঐতিহ্যও।

আজও কোনো গ্রামের হাটখোলায় হয়তো বসে আছেন সুশান্ত শীল। সামনে ছোট্ট আয়না, পাশে কাঁচি-ক্ষুর। একটু দূরে দাঁড়িয়ে হয়তো অপেক্ষা করছেন কোনো গ্রাহক। কাঁচির শব্দ উঠছে-কচ্ কচ্। কিন্তু সেই শব্দের ভেতরে এখন আর শুধু জীবিকার স্বাভাবিক ছন্দ নেই মিশে আছে টিকে থাকার সংগ্রাম, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।

গ্রামবাংলার সেই কাঁচির শব্দ কতদিন আর শোনা যাবে-সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

আরও পড়ুন: রবি দেওয়ান: আলো-ছায়ার অবহেলিত যাত্রা

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad