জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেওয়া বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামানের কোম্পানি গচিহাটা অ্যাকোয়াকালচার ফার্মস পুঁজিবাজার থেকে টাকা তুলে ব্যবসা করলেও বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিচ্ছে না। কোম্পানিটির ১০৯ একর জমির হিস্যাও এই বিনিয়োগকারীরা কখনো পাবে কিনা, তা নিয়েও আছে শঙ্কা।
১৯৯৪ সালে আখতারুজ্জামান যখন প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য ছিলেন, সে সময় প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ১৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা তোলা হয়।
বর্তমানে কোম্পানির শেয়ার কেবল ২৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা-পরিচালকের হাতে। ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এর চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান ও পরিচালক তার স্ত্রী সালমা জামান। ১৯৮৭ সালে তারা কটিয়াদি উপজেলার গচিহাটা গ্রামে ৬ দশমিক ৩০ একর জমিতে কোম্পানিটির যাত্রা শুরু করেন।
পর্ষদে অতীতে আরও তিনজন ছিলেন। তারা হলেন মোহা. শাহরিয়ার জামান, মোহা. সাব্বির জামান এবং সরলা খাতুন। তারা কবে এবং কেন বাদ গেছেন, সে বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের কিছু জানানো হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির ৫৬ শতাংশ শেয়ারই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মালিকানা আছে ১৮ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ আখতারুজ্জামান ও তার স্ত্রী প্রতি চারটি শেয়ারের একটির মালিক হয়ে সম্পদের শতভাগই ভোগ করছেন।
২০২২ সালে ওভার দ্য কাউন্টার বা ওটিসিতে থাকার সময় এক শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করলেও তা বিতরণ করা হয়েছে, এমন নিশ্চিত তথ্য নেই।
গচিহাটা অ্যাকোয়াকালচার ফার্মসের ওয়েবসাইটে দুইটি মোবাইল নম্বর ও একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দেওয়া আছে। সেখানে কল করলে দুটি নম্বরেই ফোন ধরেন দুইজন কর্মী। তারা জানান, মাছের উৎপাদন ও বিপণন বেশ ভালো মতোই চলছে। তবে তারা তাদের নাম-পরিচয় বলেননি।
তারা ঢাকার মিরপুরে মূল অফিসে কাজ করেন বলে জানান। দুজনেই কিশোরগঞ্জের ফার্মের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির নম্বর দিতে চাইলেও পরে আর দেননি। আখতারুজ্জামান হাজতে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম টাইমসকে বলেন, ‘কোম্পানিটি নজরদারির একেবারে বাইরে, এমনটি বলার সুযোগ নেই। সেটি ওটিসি মার্কেটে আছে, সেখানে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনাবেচা করতে পারবেন।’
তবে ওটিসি মার্কেটে শেয়ার কেনাবেচা সহজ নয়। বিক্রির অর্ডার দিলেও ক্রেতা মেলে না বললেই চলে।
বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী টাইমসকে বলেন, ‘কোম্পানি যদি না চলে, এজিএম হলে শেয়ারহোল্ডাররা কোম্পানির কাছে জিজ্ঞেস করবে, আমাদের শেয়ার কোথায়? এই এত অ্যাসেট আছে, এগুলো ডিসপোজ করতে, এই প্রশ্নগুলো করতে পারে।’
যেখানে এজিএম হচ্ছে না, সেখানে বিনিয়োগকারীর পক্ষে তো কিছু করা সম্ভব নয়-এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘তাহলে তারা হাইকোর্টে যেতে পারেন।’ এজিএম করতে বিএসইসি বাধ্য করতে পারে বলেও মত দেন তিনি।
বিপুল সম্পদ
২০২২ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানিটির ৮৫ একরের পুকুর এবং ২৪ একর জমির দাম হতে পারে ৫৫৬ কোটি টাকা। গত চার বছরে এই দাম আরও বেড়েছে।
কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ২০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। প্রতিটি শেয়ারের ফেস ভ্যালু ১০ টাকা। যদি ২০২২ সালের জমির দাম অনুমান করা হয়, তাহলে শেয়ার প্রতি সম্পদ হয় ২৬৮ টাকার বেশি।
২০২৫ সালে কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতেও সব দায় বাদে শেয়ারপ্রতি সম্পদ দেখানো হয়েছে ২১৮ টাকা ৬০ পয়সা। আইপিওতে যাওয়ার আগে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ছিল ৫ কোটি টাকার মতো।
নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ ও শেয়ার ডিমেট না করাসহ নানা কারণে ২০০৯ সালে কোম্পানিটিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ড থেকে তালিকাচ্যুত করে ওভার দ্য কাউন্টার বা ওটিসিতে স্থানান্তর করা হয়।
কিন্তু এরপরের ১৭ বছরেও কোম্পানি পরিচালনায় স্বচ্ছতা আসেনি, আর বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির শেয়ার কিনে হতোদ্যম হয়েছেন। ওটিসিতে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৯ টাকার ঘরে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের টাকা কার্যত আত্মসাৎ করা হয়েছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামান ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে সেই সময়ের কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয় পান। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনেও তিনি জয় পান। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার পর হেরে যান। এরপর আর মনোনয়ন পাননি।
বিএনপিতে থাকার সময়ই দলের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে তিনি মোট পাঁচবার দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন। পরে আবার ফিরেও আসেন। ২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর নানা সময় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করেছেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আন্দোলনকারীদের ‘ষড়যন্ত্রকারী’ আখ্যা দিয়েছেন তিনি। দাবি করেছেন, শেখ হাসিনা সসম্মানে ভারত থেকে ফিরে আসবে।
২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর আখতারুজ্জামানের জামায়াতে যোগদানের খবর রাজনীতিতে বিস্ময় তৈরি করে এ কারণে যে, তিনি স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া দলটিকে অতীতে অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় আক্রমণ করেছেন।
‘জন্মগতভাবে দুর্বল কোম্পানি’
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলার গচিহাটা এলাকায় এই প্রতিষ্ঠানটি মাছের পোনা উৎপাদন ও মাছ চাষের জন্য এক সময় প্রসিদ্ধ ছিল। ১৯৯৫ সালের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং ১৯৯৬ সালের সরকার প্রধান শেখ হাসিনার কাছ থেকে ‘বেস্ট ফার্ম অ্যাওয়ার্ড’ পায় তারা। রাষ্ট্রপতির কৃষি পদক পাওয়ার কথাও উল্লেখ আছে কোম্পানির ওয়েবসাইটে।
তবে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘এই কোম্পানি (গচিহাটা অ্যাকোয়াকালচার) তালিকাভুক্তির আগেও ভালো ছিল না। জন্মগতভাবেই দুর্বল ছিল। কিন্তু তারপরও এটাকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। এটা নিয়মিত এজিএম করেনি, লভ্যাংশ দেয়নি, এমনকি লিস্টিং ফিও দেয়নি সম্ভবত।’
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এক পরিচালক বলেন, ‘শেয়ার বিক্রি করে টাকা তুলে পরবর্তীতে কোম্পানি আর ভালোভাবে চালায়নি, নিয়মিত এজিএম করেনি। কোনো কিছুই নিয়ম মতো পরিচালনা করেনি। যার কারণে পরে একটাকে মূল বোর্ড থেকে তালিকাচ্যুত করা হয়।’
ওই শেয়ারকে ঘিরে সবসময় কারসাজি হয়েছে বলেও জানান ওই পরিচালক। তিনি বলেন, ‘এটা খারাপ আইপিও ছিল।’
আইপিওর টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে মত দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আখতারুজ্জামান কতটুকু খেতে পেরেছেন জানি না, তবে কোম্পানিটা ভালো করে চালানো হয়নি। হয়ত এটাই তিনি চেয়েছেন, সবার নজরদারি, জবাবদিহির বাইরে চলে যেতে চেয়েছেন। তাই মূল বোর্ড থেকে তালিকাচ্যুতি চেয়েছেন।’
২০২১-২২ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত হিসাবে কোম্পানির মোট মুনাফা ছিল ১৩৯ কোটি ২৪ লাখ ২০ হাজার টাকা। কোম্পানিটি ওই বছর অগ্রণী ব্যাংক থেকে ১৪০ কোটি ৫৯ লাখ ১৪ হাজার ৭৯৯ টাকা সুদ মওকুফ পায়। এ কারণেই এই বিপুল মুনাফা হয়।
পরের বছরই, অর্থাৎ ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়া হিসাবে ২ কোটি ১৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা লোকসান দেখানো হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, কোম্পানির পরিচালন আয় ২ কোটি ৫০ লাখ ৪২ হাজার টাকা। যেখানে পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি ৫১ লাখ ৩ হাজার টাকা। প্রায় ৬০ হাজার টাকার পরিচালন লোকসান দাঁড়ায়।
তবে শেষ পর্যন্ত ট্যাক্স, প্রি-অপারেশন ডেভেলপমেন্ট এক্সপেন্স ইত্যাদি বাদ দিয়ে শেষ পর্যন্ত লোকসান দাঁড়ায় ২ কোটি ১৪ লাখ। একইভাবে ২০২৩ সালে ২ কোটি ২৩ লাখ, ২০২৪ সালে ৭৮ লাখ ৩৩ হাজার টাকা এবং ২০২৫ সালে ৪৯ লাখ ১১ হাজার টাকা লোকসান দেখানো হয়।
আর্থিক প্রতিবেদনে নানা অসংগতিও উঠে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানি কোনো ফিক্সড অ্যাসেট রেজিস্টার বা নির্দিষ্ট সম্পদের তালিকা সংরক্ষণ করেনি।
বায়োলজিক্যাল অ্যাসেটস বা ৩ লাখ ৮০ হাজার ২৫০ টাকার গাছপালার সম্পদ আন্তর্জাতিক হিসাব মান অনুযায়ী, বর্তমান ন্যায্য মূল্যে হিসাব না করে ঐতিহাসিক খরচে দেখানো হয়েছে। ফেয়ার ভ্যালু হিসাব না করায় এর আর্থিক প্রভাব নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
২ কোটি ৯১ লাখ ৪৫ হাজার ৫৯৬ টাকার মজুত পণ্যের ক্ষেত্রে অডিটরদের যাচাইকরণের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং পণ্যের পরিমাণ ও মূল্যের বিস্তারিত তালিকা সরবরাহ করা হয়নি। ১ কোটি ৯৩ লাখ ৭৭ হাজার ৫২৪ টাকার অগ্রিম ও আমানতের পক্ষে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নাম, ঠিকানা ও ব্রেকআপ দেওয়া হয়নি।
বহু বছর ধরে কোম্পানি স্থগিত কর (ডেফার্ড ট্যাক্স) হিসাব করেনি এবং ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্ট করেনি। প্রয়োজনীয় আর্থিক নথি না থাকায় সমন্বয়যোগ্য অঙ্ক নির্ধারণ করা যায়নি।
লিজ দায়ের অবচয়, ক্ষতি বা পুনর্বিবেচিত হিসাবের কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। বহু বছর ধরে একই ব্যালেন্স বয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২৩২ ধারা অনুযায়ী ওয়ার্কারস প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড গঠন বা পরিচালনা করা হয়নি। ঘোষিত ৬ কোটি ৯৩ লাখ ৬ হাজার ৯০৪ টাকার রাজস্ব আয়ের পক্ষে পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত নথিপত্র দেওয়া হয়নি। ৫ কোটি ৮১ লাখ ২ হাজার ২৮৮ টাকার বিক্রিত পণ্যের খরচের সপক্ষেও প্রমাণপত্র দেওয়া হয়নি।
সাধারণ ও প্রশাসনিক খরচ ১ কোটি ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৫৩৬ টাকা এবং বিক্রয় ও বণ্টন খরচের ১০ লাখ ২৬ হাজার ১৬০ টাকার সপক্ষে প্রয়োজনীয় দলিল সরবরাহ করা হয়নি।


