তিন বছর পর প্রথমবারের মতো সরকারের সব ট্রেজারি বিলের ইল্ড ৮ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। রোববারের নিলামে ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলে লগ্নির বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত বার্ষিক মুনাফার হার বা ইল্ড যথাক্রমে ৭ দশমিক ৬৫, ৭ দশমিক ৭৫ এবং ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশে নেমে আসে।
ব্যাংকার ও বিশ্লেষকরা বলছেন, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর হাতে জমে থাকা উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি ঋণপত্রে বিনিয়োগে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ কমছে।
অন্যদিকে, সরকারী ঋণপত্রের পাশাপাশি আমানতের সুদহার কমে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির বিপরীতে সঞ্চয়কারীদের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।
নিলামে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের কাট-অফ ইল্ড ৪৮ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশে নেমেছে। আগের নিলামে এ হার ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ।
একইভাবে ১৮২ দিন মেয়াদি বিলের ইল্ড ৬২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমেছে।
সবচেয়ে বেশি কমেছে ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের ইল্ড। এটির হার ৭১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৭ দশমিক ৮৮৭০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
নিলামে ৯১ দিন মেয়াদি বিলের গড় ইল্ড ছিল ৭ দশমিক ৫৮৩১ শতাংশ। অন্যদিকে ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের গড় ইল্ড ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ ও ৭ দশমিক ৮ শতাংশ।
ট্রেজারি বিল বা সরকারি ঋণপত্রে বিনিয়োগ থেকে বছরে প্রকৃত হিসাবে যে আয় পাওয়া যায়, সেটিই ইল্ড। ঋণপত্রের নির্ধারিত সুদহারের পাশাপাশি বিনিয়োগকারী কত দামে সেটি কিনছেন, তার ওপর ইল্ড নির্ধারিত হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যের কোনো ঋণপত্রে বার্ষিক সুদহার ১০ শতাংশ হলে চাহিদা কম থাকায় বিনিয়োগকারী সেটি ৯২ টাকায় কিনতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তাঁর প্রকৃত বার্ষিক মুনাফার হার বা ইল্ড ১০ শতাংশের বেশি হবে।
বিপরীতে চাহিদা বেড়ে গেলে একই ঋণপত্র ১১০ টাকায় কিনতে হতে পারে। তখন ইল্ড ১০ শতাংশের নিচে নেমে আসবে।
রোববারের নিলামে ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের জন্য জমা পড়া আবেদনের বিপরীতে আনুপাতিক বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে প্রায় ৩৫, ৬২ ও ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিনিয়োগের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ পাওয়া ঋণপত্রের পরিমাণ ছিল অনেক কম।
চার্টার্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট ও একুশ ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী আহসান মারুফ টাইমসকে বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণের দুর্বল প্রবৃদ্ধির কারণে ব্যাংকগুলো উদ্বৃত্ত অর্থ বিনিয়োগের পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছে না, বিশেষ করে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো। আমানতকারীদের সুদ বা মুনাফা দিতে তারা আগ্রাসীভাবে সরকারি ঋণপত্রে বিনিয়োগ করছে। এতে ট্রেজারি বিলের চাহিদা বাড়ছে এবং ইল্ড কমছে।
তার মতে, আর্থিকভাবে শক্তিশালী পাঁচ থেকে ছয়টি ব্যাংক বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি ঋণপত্রে বিনিয়োগ করছে।
মুদ্রানীতি শিথিল হওয়ার প্রভাবও আর্থিক বাজারে পড়ছে। আগস্টের শুরু থেকে নীতি সুদহার মোট ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর পর সম্প্রতি দ্বিতীয় দফায় সুদহার কমানোর পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বাজারসংশ্লিষ্টরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার আরো কমবে বলে আশা করছেন।
মারুফ বলেন, জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির নিয়মিত বৈঠকের আগেই আরেক দফা নীতি সুদহার কমতে পারে বলে প্রত্যাশা রয়েছে বাজারে।
এ ছাড়া প্রণোদনা ঋণের পুনঃঅর্থায়নে নতুন করে টাকা ছাপিয়ে সম্ভাব্য ২০ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করা হলে ব্যাংক খাতে তারল্য আরও বাড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি। সব মিলিয়ে ট্রেজারি বিলের ইল্ড সাড়ে ৭ শতাংশের আশপাশে থাকতে পারে বলে পূর্বাভাসে এই সম্পদ ব্যবস্থাপকের।
মারুফ বলেন, ‘আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো সেই অনুযায়ীই আমানতের সুদহার কমিয়েছে।’
তবে সুদহার কমার এই প্রবণতা সঞ্চয়কারীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির নিচে নেমে আসায় জমা রাখা অর্থের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে।
করোনা মহামারির সময় স্বল্পমেয়াদি সরকারি ঋণপত্রের মুনাফার হার ১ শতাংশের নিচে নেমে গিয়েছিল। পরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের মধ্যে ২০২৩ সালের অক্টোবরে তা ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
২০২৪ সালের অক্টোবরে ট্রেজারি বিলের ইল্ড মেয়াদভেদে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৭৫ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে পৌঁছায়। এরপর ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। চলতি বছরের জুন থেকে এই পতনের গতি বেড়েছে।
বাংলাদেশ সরকার ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ইস্যু করে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মেয়াদ দুই, পাঁচ, ১০, ১৫ ও ২০ বছর।
ডিলার ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসব সরকারি ঋণপত্রের লেনদেন হয়। এদিকে দেশের স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে সরকারি বিল কেনাবেচা না হলেও সরকারি বন্ডগুলো কেনাবেচা করা যায়। শুধু স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিল নয়, দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ডও কমছে।
গত ২২ সেপ্টেম্বরের নিলামে ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমে আসে, যা দুই বছর আগে ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশে উঠেছিল।
বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ইল্ড কমলে, উচ্চ ইল্ডে কেনা বিনিয়োগকারীরা মূলধনি মুনাফা পান। কারণ বাজারে তখন উচ্চ রিটার্নের বন্ডগুলোর চাহিদা ও দাম বেড়ে যায়।
এদিকে, ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড গত মাসে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশে নেমেছে। চলতি মাসের পরবর্তী নিলামে তা আরও কমতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
ইউসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম রাশেদুল হাসান বলেন, মুদ্রাবাজারে তারল্য পরিস্থিতি সহজ হওয়ায় বিভিন্ন মেয়াদের সরকারি ঋণপত্রের ইল্ড হার কমছে। ফলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণপত্রের ইল্ডের ব্যবধানও সংকুচিত হচ্ছে।
তার প্রত্যাশা, নির্দিষ্ট আয়ের জন্য করা বিনিয়োগ থেকে মুনাফা কমতে থাকায় আগামী মাসগুলোতে তুলনামূলক কম দামে লেনদেন হওয়া ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে পারে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা নিয়ে সতর্ক করেছেন কয়েকজন বিনিয়োগ বিশ্লেষক।
পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং কোম্পানিগুলোর মুনাফার ওপর চাপ নিয়েও সতর্ক রয়েছেন বিশ্লেষকেরা।


