রাজধানীর বাংলাবাজারে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়েন মনোয়ারা আক্তার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অথচ তাকে দিতে হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬৬৩ টাকা বেশি।
কেন বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে, তার জবাব খুঁজতে সরকারি সংস্থাগুলোর তেমন তৎপরতা নেই।
রাজধানীর হাতিরপুলের এলপিজি ব্যবসায়ী মো. সোহেল জানান, তারা এখন ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করছেন। তার দাবি, বাজারে পাঁচ-ছয়টি কোম্পানির গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। অন্যরা সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। কোম্পানিগুলোও দাম বাড়িয়েছে। ফলে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী আবদুল হক অবশ্য কোম্পানির কাছ থেকে কেনা ও খুচরা বিক্রির দাম জানাতে চাননি। বিষয়টিকে ‘ব্যবসায়িক গোপনীয়তা’ বলে এড়িয়ে যান তিনি। তবে ক্রেতার পরিচিতি অনুযায়ী সিলিন্ডারপ্রতি ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা নেন।
বাড়তি দামের বিষয়ে জানতে এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেঘনা ও ওমেরার বিপণন বিভাগে ফোন করা হলেও কেউ সাড়া দেননি।
বাজারে গ্যাসের ঘাটতি নেই বলে দাবি করেছে এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)। সংগঠনটির দাবি, সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। চাহিদা মেটাতে এ পরিমাণ যথেষ্ট। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে ব্যবসায়ী ও দোকানিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে সংগঠনটি।
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিমের দাবি, বাজারে গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত দাম খুচরা বাজারে কখনোই মেনে চলা হয়নি। তবে আগে নির্ধারিত দামের চেয়ে ১০০ টাকার মতো বেশি রাখা হলেও এখন ব্যবধানটা অনেক বড়। বাজারে পণ্য কম থাকলে ক্রেতাদের মধ্যে কেনার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, ব্যবসায়ীরা সেই সুযোগই নিচ্ছে।’
বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরেই সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি কিনতে পারছেন না ভোক্তারা। আগে সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি নেওয়া হলেও এখন বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে রান্নার গ্যাসের বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে সংসারের অন্য ব্যয় কমাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
টাইমসকে নিজের ক্ষোভের কথা জানিয়ে মনোয়ারা বলেন, ‘সবকিছুরই তো চড়া দাম। হিসাব করে বাজার করতে হয়। এত খরচ চালাই কীভাবে? প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার পর হাতে যা থাকে, তা দিয়ে এখন আর নিয়মিত মাছ-মাংস খাওয়া সম্ভব হয় না।’
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বাসাবাড়িতে তিতাসের নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ। ফলে শহরের পাশাপাশি মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের অনেক পরিবারের রান্নার প্রধান ভরসা এলপিজি সিলিন্ডার। এর চড়া দাম বড় জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করেছে।
দীর্ঘদিনের এই অনিয়মে অতিষ্ঠ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পত্রপত্রিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন বিভিন্ন এলাকায় খুচরা দোকানে অভিযান চালাচ্ছে। তবে অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা বড় পরিবেশক ও আমদানিকারক কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক এস এম নাজের হোসাইন টাইমসকে বলেন, ‘কোম্পানি আর খুচরা বিক্রেতারা মিলেমিশে সিন্ডিকেট করেই দাম বাড়ায়। সরকারও এক্ষেত্রে চুপ করে আছে। সরকার কঠোর না হলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।’
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জনবল ও আইনগত ক্ষমতা কমিশনের নেই। সরকারের নির্দেশনায় জেলা প্রশাসন মূলত বাজারে অভিযান পরিচালনা করে।
তবে রান্নার গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্রিয় পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর নীতি ও কৌশলবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে সভায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও নির্ধারিত দামে বিক্রির স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডিলাররা কতটুকু গ্যাস পাচ্ছেন এবং কার কাছে বিক্রি করছেন, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সরকারি এসব অভিযানের সুফল এখনো পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে বিইআরসির ওপর ক্ষোভ জানিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি।
ব্যবসায়ীদের দাবি, বিইআরসি গত পাঁচ বছর ধরে সিলিন্ডারপ্রতি কমিশন ৫০ টাকা নির্ধারণ করে রেখেছে। অথচ পরিবহন, কর্মচারী ও গুদাম খরচ মেটাতেই ব্যয় হয় ১১০ টাকা। এ কারণে কমিশন বাড়িয়ে ১৫০ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানাকে ‘অযৌক্তিক’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী নেতা সেলিম খান।
বিইআরসির মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। কমিশনকে দেওয়া এক চিঠিতে তারা জানান, কিছু কোম্পানির পাইকারি দামই বিইআরসির নির্ধারিত খুচরা দামের চেয়ে বেশি। সব কোম্পানির আমদানি ব্যয় সমান নয় বলে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, কোম্পানিগুলো নিজেদের খরচ হিসাব করে দামের তালিকা জমা দেয়। বিইআরসি তা বিবেচনায় না নিয়ে সব খরচের গড় হিসাব করে দাম নির্ধারণ করে। ফলে নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারের ব্যবধান তৈরি হয়।
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম, ডলারের বিনিময় হার ও জাহাজভাড়ার ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে বিইআরসি। তবে এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ ভোক্তাদের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয় না। গণশুনানির মাধ্যমে দাম নির্ধারণে আদালতের নির্দেশও দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত হচ্ছে।


