দেশের উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে রাখতে হবে সবুজ প্রবৃদ্ধি: সানেম

দেশের উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে রাখতে হবে সবুজ প্রবৃদ্ধি: সানেম
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে সবুজ প্রবৃদ্ধিকে (গ্রিন গ্রোথ) রাখতে হবে।

এ জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, সহজ শর্তে অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক নীতিসংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘ক্যান গ্রিন গ্রোথ ড্রাইভ বাংলাদেশ’স নেক্সট ফেইজ অব ডেভেলপমেন্ট?’ শীর্ষক এ সংলাপের আয়োজন করে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)।

সংলাপে সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দূর করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক জলবায়ু অঙ্গীকারের সঙ্গে দেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারগুলোর সমন্বয় করতে হবে। পাশাপাশি সবুজ প্রবৃদ্ধি বাস্তবায়নে নীতিগত সামঞ্জস্য, খাতভিত্তিক লক্ষ্য এবং কার্যকর বাস্তবায়নব্যবস্থা প্রয়োজন, যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার ও রূপান্তর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ব্যক্তিগত ভোগ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। তবে এ রূপান্তরের সুফল যেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করা জরুরি। আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের বড় অংশ এখনো প্রশমন কার্যক্রমে কেন্দ্রীভূত। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের প্রায় ৬৫ শতাংশ প্রশমনে এবং ৩৫ শতাংশ অভিযোজন কার্যক্রমে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন অর্থায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে এসব সম্পদ কার্যকরভাবে ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) মনজুর হোসেন ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এ লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রয়োজন হবে। তিনি ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনার পাশাপাশি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজলভ্য সবুজ অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।

বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের (বিইপিআরসি) পরিচালক (উদ্ভাবন) হাসান মাহমুদ জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং দেশীয় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, জ্বালানির বিকল্প নির্ধারণে সাশ্রয়ী মূল্য, সহজলভ্যতা এবং উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণের সুযোগ বিবেচনা করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে আগ্রহ বাড়লেও জমির সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

চামড়া শিল্পের জন্য গত দুই দশকেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করতে না পারার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি নীতি বাস্তবায়নের দুর্বলতা তুলে ধরেন।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক বেশি। মূলধনি ব্যয়ভিত্তিক মডেলে এক মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে প্রায় ৬ থেকে ৮ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। তাই শুধু স্থাপন ব্যয় নয়, অর্থায়ন ও পরিচালনসংক্রান্ত সমস্যারও সমাধান করতে হবে।

নিউএজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জ্বালানি ব্যয় কমতে পারে। তবে প্রাথমিক বিনিয়োগের উচ্চ ব্যয়, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, করসংক্রান্ত বাধা এবং নীতির দুর্বল প্রয়োগের কারণে এ ব্যবস্থার বিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের প্রকল্প অর্থনীতিবিদ মেহেরুনা আই. চৌধুরী বলেন, সবুজ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজমসহ (সিবিএএম) আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবর্তিত পরিবেশগত শর্ত পূরণে বাংলাদেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত করতে হবে।

সংলাপে সৌর প্যানেল ও ইনভার্টারের গুণগত মান, নেট মিটারিং ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা, সৌরচালিত সেচ এবং জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বয়ের বিষয়েও আলোচনা হয়।

এ ছাড়া জলবায়ু অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, জনসচেতনতা তৈরি, কারিগরি সহায়তা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা।

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রেক্ষাপটে এসব উদ্যোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে সংলাপে উঠে আসে।

সমাপনী বক্তব্যে ড. সেলিম রায়হান বলেন, সবুজ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বৃহত্তর শিল্পনীতি কাঠামো প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ও আমলাতান্ত্রিক বাধা অতিক্রমের পথ সহজ করতে হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad