সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে গ্রাহকদের চরম ভোগান্তি

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে গ্রাহকদের চরম ভোগান্তি
Advertisement
Advertisement

মেয়ের বিয়ের জন্য আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করেছিলেন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের এক প্রবীণ গ্রাহক। ভেবেছিলেন, ব্যাংকে জমা রাখা ৩০ লাখ টাকা তুলে ঋণের টাকা শোধ করবেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে ঘুরেও নিজের জমানো টাকা তুলতে পারছেন না তিনি।

টাকা তুলতে গেলে ব্যাংক থেকে তাকে জরুরি প্রয়োজনের প্রমাণ দিতে বলা হয়। তিনি ব্যক্তিগত ধারদেনা শোধ করবেন-এ কথা জানানোর পর চাওয়া হয় ব্যক্তিগত ঋণ করার চুক্তিপত্র।

ব্যাংকের এই শর্ত শুনে হতাশ এই গ্রাহক টাইমসের কাছে প্রশ্ন তোলেন–নিজের টাকা তুলতে আবার কিসের কাগজপত্র? কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনার লিখিত চুক্তি করে কি না এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।

রোববার ব্যাংকটিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার এমন বেশ কয়েকজন গ্রাহকের দেখা পান এই প্রতিবেদক।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ঋণ কেলেঙ্কারিসহ নানা কারণে বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের দুরবস্থা দেখা দেয়। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এসব ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের আমানত তুলে নেওয়ার হিড়িক পড়ে। একপর্যায়ে গ্রাহকদের আমানত ফিরিয়ে দিতে সংকটে পড়ে কয়েকটি ব্যাংক।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক এমন দুর্বল পাঁচটি ব্যাংকে একীভূত করে গঠন করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। এই ব্যাংক পাঁচটি হচ্ছে সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক।

‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের পর কর্তৃপক্ষের আশ্বাস ছিল, সেপ্টেম্বর মাস থেকে এসব ব্যাংক থেকে স্বাভাবিকভাবেই টাকা তোলা যাবে। কিন্তু ঘোষণার দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও গ্রাহকদের ভোগান্তি কমেনি। টাকা তুলতে গিয়ে চরম হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে তাদের।

জরুরি কাগজের শর্ত ও ধীরগতি

ব্যাংকগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা তুলতে চাইলে মেডিকেল রিপোর্ট, হজে যাওয়ার নিবন্ধন নথি কিংবা জমি কেনার বায়নাপত্রের মতো প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু আত্মীয়স্বজনের অনানুষ্ঠানিক ধারদেনা মেটাতে তো কোনো লিখিত চুক্তি থাকে না, ফলে বিপাকে পড়েছেন অনেক আমানতকারী।

আরও পড়ুন

চিকিৎসার জন্য টাকা তোলার আবেদন করা এম আবু নাছের টাইমসকে বলেন, আবেদন জমা দিতেই দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আর সেই আবেদন মঞ্জুর হয়েছে কি না, তা জানারও কোনো সহজ ব্যবস্থা নেই।

একই ভোগান্তির কথা জানান ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও আরিফ হোসাইন রুমেল। তাদের মধ্যে রুমেলের অ্যাকাউন্টে প্রায় ৬০ লাখ টাকা থাকলেও অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার কাগজপত্র জমা দিয়ে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৩ লাখ টাকা। এক্সিম ব্যাংকের আমানতকারী তাব্বাসুম আখতারও তার এফডিআরের টাকা তুলতে পারছেন না।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের এক কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে একসঙ্গে সব গ্রাহককে পুরো টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়। তাই জরুরি প্রয়োজন দেখে পর্যায়ক্রমে টাকা দেওয়া হচ্ছে। কিছু গ্রাহক টাকা তুলে অন্য ব্যাংকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করায় আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করতে কিছুটা সময় লাগছে।’

পুরো পরিস্থিতিকে একটি ‘জাতীয় সংকট’ উল্লেখ করে গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানান তিনি।

মুনাফা না মেলার অভিযোগ

অনেক কষ্ট করে দীর্ঘ অপেক্ষার পর মূল টাকা পেলেও জমানো টাকার ওপর অর্জিত মুনাফা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারী মদিনা তঞ্চঙ্গ্যা জানান, তিন বছর মেয়াদী ১০ লাখ টাকার এফডিআরের মেয়াদ শেষ হলেও দীর্ঘদিন পর তিনি শুধু মূল টাকা তুলতে পেরেছেন। মুনাফা দেওয়া হয়নি। তাকে বলা হয়েছে, মুনাফা নিতে হলে আবার নতুন করে এফডিআর করতে হবে। একইভাবে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর শাখার আরাফাত ইসলাম এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের গ্রাহক মোস্তফা কামাল জানান, সফটওয়্যার সমস্যা ও বিভিন্ন অজুহাতে তাদের অর্জিত মুনাফা আটকে রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র টাইমসকে জানান, টাকা না পাওয়ার কোনো লিখিত অভিযোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এখনো আসেনি। কোথাও কোনো সমস্যা হলে ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করার বার্তা দেওয়া হবে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। সেই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক যদি জমানো টাকার ওপর মুনাফা ত্যাগ করার শর্তে রাজি হন, তবেই তিনি দ্রুত মূল টাকা ফেরত পাচ্ছেন। ইতিমধ্যে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার গ্রাহক এ নিয়মে আবেদন করেছেন এবং এর মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার গ্রাহক মূল টাকা তুলে নিয়েছেন।

পাঁচটি ব্যাংকের আমানতকারীরা তাদের পাওনা আদায়ে গড়ে তুলেছেন ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম।

সংগঠনটির চট্টগ্রাম কমিটির প্রতিনিধি শারমিন আক্তার বলেন, ‘পাঁচটি ব্যাংকের প্রায় ৮৪ লাখ আমানতকারীর কষ্ট এখনো কাটেনি। শুধু মূল টাকা দিলে হবে না, অন্যান্য ব্যাংকের মতো গ্রাহকদের পুরো মুনাফাও বুঝিয়ে দিতে হবে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad