ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে বরখাস্ত, পরে তদন্ত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে বরখাস্ত, পরে তদন্ত
Advertisement
Advertisement

আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়জন অধ্যাপককে সাময়িক বরখাস্ত ও একাডেমিক-প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার দুই মাস পর তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি টাইমসকে নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুইজন জ্যেষ্ঠ সদস্য। তবে তদন্ত কমিটি কী করবে, সে বিষয়ে তাদের বক্তব্য স্পষ্ট নয়।

বিজ্ঞান অনুষদের ডিন মো. মোফাজ্জল হোসেন টাইমসের প্রশ্নে বলেন, ‘তদন্ত কমিটি অভিযুক্ত শিক্ষকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেবে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেবে।’

সাময়িক বরখাস্ত হওয়া একজন অধ্যাপক বলছেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩-এর লঙ্ঘন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ টাইমসকে বলেন, ‘তদন্তের মাধ্যমে দোষ প্রমাণ না করে আগেই শাস্তি (বরখাস্ত) দেওয়া এবং পরবর্তীতে তদন্তের আয়োজন করা আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ। এটিকে একটি রূপক দিয়ে ব্যাখ্যা করে বলা যায়: কাউকে আগে ফাঁসি দিয়ে পরে তার বিচার শুরু করার মতো অবস্থা।’

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পদক্ষেপকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখছেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন বা সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। সরাসরি কোনো সহিংসতা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত না থেকে কেবল কোনো রাজনৈতিক বা সরকার সমর্থক অবস্থানের কারণে কাউকে চাকরিচ্যুত করা বা অপরাধী সাব্যস্ত করা অযৌক্তিক ও বেআইনি।’

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় গত ২৮ জুলাই সিন্ডিকেট সভায় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম ও অধ্যাপক আফরোজা শেলীকে সাময়িক বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।

ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল মুহিত, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আবু সারা শামসুর রউফ এবং শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলামকে সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার কথা জানানো হয়।

আরও পড়ুন

পরদিন এ সম্পর্কে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী কী, সেটিও এই অধ্যাপকদেরকে জানানো হয়নি। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে অধ্যাপকদের কাউকে কারণ দর্শানো হয়নি, কাউকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও দেওয়া হয়নি।

অধ্যাপক শফিকুল টাইমসকে বলেন, ‘কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরই কেবল সাময়িক বরখাস্তের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা। কিন্তু এখানে তদন্ত বা প্রমাণ ছাড়াই আগে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং বরখাস্তের দুই মাস পরে সেপ্টেম্বরের শেষে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।’

তিনি জানান, জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভাগের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের তালিকায় তার নাম ছিল সবার শেষে। পরে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে ক্ষমা চাইলে তারা শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেবে।

পরে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অভিযোগগুলোর যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করে শিক্ষার্থীদেরকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্য অনুরোধ করেন এই অধ্যাপক।

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর করে ইতিবাচক পরিবেশে বিষয়টি দ্রুত মীমাংসা করা।

ওই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অধ্যাপক শফিকুলকে চিঠি দিয়ে জানায়, কমিটির অনুসন্ধান চলাকালে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক সকল কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়েছে।

তথ্যানুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন জমার পর বিষয়টি আর এগোয়নি। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি জেতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসন এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। জুলাইয়ের শেষে আসে সাময়িক বহিষ্কার ও একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত।

অধ্যাপক শফিকুল বলেন, ‘তথ্যানুসন্ধান রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সিন্ডিকেটের যে রেজুলেশনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার অনুলিপি চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হলেও আমাকে তা দেওয়া হয়নি। এই রিপোর্ট পেলে আমি বুঝতে পারতাম আমার বিরুদ্ধে প্রকৃত অভিযোগগুলো কী কী এবং কোন অভিযোগের ভিত্তিতে আমাকে বরখাস্ত করা হলো।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী টাইমসকে বলেন, সিন্ডিকেট একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই কমিটিতে তিনি নেই।

বিজ্ঞান অনুষদের ডিন মো. মোফাজ্জল হোসেন বলেন, এ ব্যাপারে চিঠি এসেছে এবং কেবল কমিটি গঠিত হয়েছে। এখনও তদন্ত শুরু হয়নি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad