ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি আছেন ৯০ জন। কিন্তু তাদের দেখাশোনার জন্য দায়িত্বে আছেন মাত্র দুজন নার্স। এর মধ্যে একজনকে নতুন রোগী ভর্তি করা, সুস্থ হওয়া রোগীদের ছুটি দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির কাজ সামলাতে হয়। ফলে পুরো ওয়ার্ডের সব রোগীর সেবা দেওয়ার দায়িত্ব গিয়ে পড়েছে অন্য মাত্র একজন নার্সের ওপর।
মারজিনা আক্তার নামের এক জ্যেষ্ঠ নার্স যেন এক মুহূর্ত দম ফেলার সময় পাচ্ছেন না। গত শনিবার দুপুরে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, তিনি একটার পর একটা কাজ করে যাচ্ছেন। একজন রোগীর স্যালাইন শেষ করে তিনি দ্রুত ছুটে যাচ্ছেন আরেকজনের হাতে ক্যানুলা বসাতে।
সেই কাজ শেষ হতে না হতেই এক আশঙ্কাজনক রোগীর স্বজন এসে হাজির। তার সমস্যার সমাধান করে তিনি আবার দৌড়াচ্ছেন অন্য রোগীর দিকে। মর্জিনা আক্তারের এই অবস্থা দেখে সহকর্মী রাজু দস্তগীরও কাগজপত্র ও দাপ্তরিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন।
ক্লান্ত গলায় মারজিনা দ্য টাইমসকে বলেন, ‘এক মিনিটের জন্য বসার উপায় নেই। সব রোগীই খুব অসুস্থ, আর সবাই চান আগে যেন তার চিকিৎসা করা হয়।’
সহকর্মী রাজু বলেন, ‘আপা যখন অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন আমি রোগীদের দিকে খেয়াল রাখি আর উনি কাগজের কাজগুলো করেন।’
নার্সের মতো ডাক্তারদের অবস্থাও একই রকম। প্রতি শিফটে ৯০ জন রোগীর জন্য সর্বোচ্চ তিনজন ডাক্তার থাকেন। সাধারণত দুজন একসঙ্গে ডিউটি করেন, আর একজন তখন কিছুটা বিশ্রাম নেন।
দিন দিন ডেঙ্গু রোগী বাড়ায় হাসপাতালগুলো সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। হঠাৎ রোগীর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হওয়া, শক সিন্ড্রোম দেখা দেওয়া এবং চিকিৎসা নিয়ে রোগীদের নানা ভুল ধারণার কারণে ডাক্তার-নার্সদের প্রতিনিয়ত কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে।
কাজের প্রচণ্ড চাপে স্বাস্থ্যকর্মীরা বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছেন না। এতে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। শারীরিক ও মানসিকভাবে অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ার কারণে রোগীদের ঠিকমতো সেবা দেওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইন্টার্ন ডাক্তার রোকসানা আক্তার গত এক মাস ধরে এই ওয়ার্ডে কাজ করছেন। এর মধ্যে তিনি ১১টি নাইট শিফট আর ১৩টি ডে শিফট শেষ করেছেন। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘যেদিন নাইট ডিউটি থাকে, সেদিন রাত ১০টার আগে বাড়ি ফেরা যায় না। আবার পরদিন সকাল ৮টার মধ্যেই পরের শিফটের জন্য চলে আসতে হয়।’
হাসপাতালের ৭০ শয্যার অন্য একটি ডেঙ্গু ওয়ার্ডেও গিয়ে একই দৃশ্য দেখা গেছে। সেখানে রোগীদের সেবা দিচ্ছিলেন কেবল একজন ডাক্তার শাহ মো. গালিব আলম। তিনি জানান, সঙ্গে থাকা অন্য ডাক্তার ক্লান্ত হয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন।
একই অবস্থা পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও। সেখানে ডাক্তার তুরিন আহমেদ বলেন, ‘হঠাৎ করেই খুব আশঙ্কাজনক রোগী চলে আসছে। প্রতিটি রোগীকে দিনে অন্তত তিনবার করে গিয়ে দেখতে হয়। এর মধ্যে কেউ শক সিন্ড্রোমে চলে গেলে অন্য সব কাজ ছেড়ে তার দিকে ছুটতে হয়। সব মিলিয়ে ডিউটির সময় একটু বিশ্রাম নেওয়ারও উপায় থাকে না।’
ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম হলে রোগীর রক্তচাপ দ্রুত বিপজ্জনক মাত্রায় নেমে যায়, তাই সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। কিন্তু ডাক্তারদের সাধারণ রাউন্ড দেওয়া ও নতুন রোগী সামলানোর পাশাপাশি এসব জরুরি চিকিৎসাও একসঙ্গে চালাতে হয়।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির মূল কারণ ডাক্তার ও নার্সের সার্বিক ঘাটতি। সেই সাথে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অসম পদায়ন ও দীর্ঘদিন পদ খালি পড়ে থাকায় এই সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য নিবন্ধিত ডাক্তার আছেন মাত্র শূন্য দশমিক ৭৩ জন। এর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে সরকারিভাবে কাজ করেন মাত্র শূন্য দশমিক ১৮ জন।
সরকারি স্বাস্থ্য খাতের মোট পদের ২৮ দশমিক ৬ শতাংশই খালি পড়ে আছে, যার মধ্যে চিকিৎসকদের পদ খালি ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে ৩০ হাজার ৩১১ জন ডাক্তার কর্মরত থাকলেও আরও ১১ হাজার ৪৯৫টি পদ ফাঁকা ছিল।
নার্সদের ঘাটতি আরও বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য অন্তত ৪৫ দশমিক ৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে আছেন মাত্র ১২ দশমিক ৭৮ জন। আবার প্রতি একজন ডাক্তারের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশে আছেন মাত্র শূন্য দশমিক ৭৪ জন। এমনকি ডাক্তারের অনুপাতে পাঁচজন মিডওয়াইফ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে একজনও নেই।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য নার্স আছেন মাত্র শূন্য দশমিক ৫৪৯ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, দেশে এই মুহূর্তে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার নার্সের ঘাটতি রয়েছে।
শূন্য পদের পাশাপাশি অনেক স্বাস্থ্যকর্মী কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকায় সংকট আরও বেড়েছে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে যারা দায়িত্বে থাকেন, তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া বাগেরহাট সদর হাসপাতালের ডাক্তার সাকিয়া হকের একটি ভিডিওতে এই ভোগান্তির চিত্র দেখা যায়। রোববার দুপুর আড়াইটা থেকে পরদিন সকাল সাড়ে আটটা পর্যন্ত তিনি একাই জরুরি বিভাগে ডিউটিতে ছিলেন। রাত ১ টার দিকে ২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রায় ৪৫০ জন রোগী ছিল, অথচ চিকিৎসকের দায়িত্বে ছিলেন শুধু তিনি একা।
তিনি জানান, একদিকে জরুরি বিভাগ, অন্যদিকে মেডিসিন, সার্জারি, শিশু ও গাইনি বিভাগ থেকে আসা নতুন রোগী—সব একা সামলাতে হচ্ছিল। তার ওপর ঊধ্বর্তন মহলের তদবির ও নানা সামাজিক চাপ তো আছেই। চাকরি হারানোর ভয়ে অনেকেই এই মানসিক চাপ সহ্য করতে বাধ্য হন।
ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডেঙ্গু ওয়ার্ডে কাজ করা ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী চরম মানসিক ক্লান্তিতে ভুগছেন। ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ ডাক্তার কাজের চাপে পুরোপুরি ‘বার্নআউট’ বা চরম মানসিক অবসাদে আক্রান্ত। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সংক্রমণের ভয়, ঘুমের ব্যাঘাত এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবই এর প্রধান কারণ।
এই সার্বিক সংকট নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার সহকারী পরিচালক এস এম মাহমুদুর রশীদ টাইমস’কে বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই ডাক্তারের ঘাটতি রয়েছে। তবে ডেঙ্গু মৌসুম সামনে রেখে অতিরিক্ত ডাক্তার পদায়ন করা হয়েছিল। যেখানে এখনো সংকট রয়েছে, সেখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত ডাক্তার নিয়োগ দেবে।’


