এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে আবেগ বয়ে নিয়ে যাওয়া প্রতিটি চিঠির শুরু হয় কোনো নাম, স্মৃতি কিংবা না বলা কথাকে ঘিরে। যাদের মিস করি, তাদের কাছে চিঠি লিখি এই আশায় যে, আমাদের পক্ষে যেখানে পৌঁছানো সম্ভব নয়, সেখানে হয়তো শব্দ পৌঁছে যাবে। কিন্তু যাকে চিঠি লিখতে চাই, সে যদি চিরতরে হারিয়ে যায়, তখন কী হয়?
বিশ্ব ডাক দিবসে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত চিঠি উৎসব যেন পেল ভিন্ন এক অর্থ। রোববার কুমিল্লা ডাক বিভাগ আয়োজিত এই উৎসব উৎসর্গ করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের স্মৃতির প্রতি।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকালে আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে কুমিল্লার কোটবাড়ি গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। এরপর সে আর বাসায় ফেরেনি। ওই দিন তার বাবা ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
শিক্ষার্থীরা যখন প্রিয়জনদের কাছে চিঠি লিখছিলেন, প্রতিটি খামের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কারও কাছে পৌঁছানোর প্রত্যাশা। কিন্তু অপ্রতিমের নাম সামনে আসতেই এমন এক প্রশ্ন উঠল, যার উত্তর কোনো ডাককর্মীর জানা নেই। প্রাপক আর বেঁচে না থাকলে চিঠি কোথায় যায়? কিংবা খামের ওপর কোন ঠিকানা লেখা উচিত?
কুমিল্লা ডাক বিভাগের উপমহাপরিচালক মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘অপ্রতিমের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ গভীরভাবে শোকাহত। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এ বছরের চিঠি উৎসব তাকে উৎসর্গ করা হয়েছে। দিনভর শিক্ষার্থীরা উৎসাহের সঙ্গে চিঠি লিখেছেন এবং প্রিয়জনদের কাছে পাঠানোর জন্য সেগুলো বুকিং দিয়েছেন।’
হয়তো চিঠির নীরব বেদনাটাই এমন। মায়ের কাছে এবং পরিবারের মতো আপনজনদের কাছে এটি মনের ভার লাঘবের এক নির্মল উপায়। চিঠি শহর পেরিয়ে যেতে পারে, স্মৃতি ধরে রাখতে পারে, এমনকি যে কথাগুলো মুখে বলা কঠিন, সেগুলোও পৌঁছে দিতে পারে। তারিকুল ইসলাম যেমন বলেছেন, ‘চিঠিগুলো যথাসময়ে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হবে।’ কিন্তু জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানের দূরত্ব পেরিয়ে যেতে পারে না চিঠি।
এই উৎসবের অদৃশ্য প্রাপক হয়ে রয়ে গেছে অপ্রতিম। তাকে বলার হয়তো এখনো অনেক কথা বাকি, লেখার অপেক্ষায় রয়েছে অসংখ্য শব্দ। শুধু সেগুলো পৌঁছে দেওয়ার মতো কোনো ঠিকানা আর নেই।


