রবি দেওয়ান: আলো-ছায়ার অবহেলিত যাত্রা

রবি দেওয়ান: আলো-ছায়ার অবহেলিত যাত্রা
শিল্পনির্দেশক রবি দেওয়ান
Advertisement
Advertisement

পৈতৃক ভিটা সাভারে হলেও জন্ম রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়িতে। সেখানেই বেড়ে ওঠা। কৈশোরেই যুক্ত হন কচিকাঁচার আসরে। সেখানে সুফিয়া কামাল, হাশেম খানের মতো গুণী মানুষের সান্নিধ্য তার শিল্পবোধকে গভীর করে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় পড়তে গিয়ে অভিনয়, মঞ্চসজ্জা আর আলো–ছায়ার জগত তাকে টানতে শুরু করে। সেই আগ্রহ থেকেই ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন শিল্প নির্দেশনার সঙ্গে। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে শুরু হওয়া সেই পথচলা আজও চলছে। বলছি দেশের স্বনামধন্য চলচ্চিত্র শিল্পনির্দেশক রবি দেওয়ানের কথা।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস সমৃদ্ধ হলেও শিল্প নির্দেশনার ক্ষেত্রটি কখনো তেমন শক্ত ভিত্তি পায়নি বলে মনে করেন রবি দেওয়ান। তার ভাষায়, আগে যেমন পেশাদারিত্বের ঘাটতি ছিল, এখনো তেমনই আছে। বরং চলচ্চিত্রে সবচেয়ে কম মূল্যায়িত জায়গাগুলোর একটি হয়ে আছে এই বিভাগ। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখানে সম্মান যেমন কম, তেমনি পারিশ্রমিকও অপ্রতুল। অনেক সময় সেই সামান্য পারিশ্রমিকও সময়মতো মেলে না।

রবি দেওয়ান অকপটে বলেন, নতুন প্রজন্মের কেউ যদি এই পেশায় আসতে চায়, তিনি বরং নিরুৎসাহিত করেন। তার মতে, এই পেশায় টিকে থাকা কঠিন। সংসার চালানো তো দূরের কথা, অনেক সময় নিজের প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে যায়। তিনি নিজেও অবিবাহিত। শিল্পচর্চার নেশাতেই সংসার গড়া হয়নি। এখন মনে হয়, হয়তো সেটাই ভালো হয়েছে।

তার মতে, একটি চলচ্চিত্রের বাজেট অনেক বড় হলেও শিল্প নির্দেশনার জন্য বরাদ্দ থাকে খুব সামান্য। অথচ একটি চলচ্চিত্রের দৃশ্যমান সৌন্দর্য, পরিবেশ এবং বাস্তবতার বড় অংশই নির্ভর করে শিল্প নির্দেশকের উপর। বিশ্ব চলচ্চিত্রে এই বিভাগের গুরুত্ব অনেক বেশি হলেও দেশে সেই স্বীকৃতি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

রবি দেওয়ান বলেন, দেশে হাতে গোনা কয়েকজন শিল্প নির্দেশকের নামই সাধারণ মানুষ জানেন। উত্তম গুহ বা তরুণ ঘোষের মতো মানুষদের সবাই শ্রদ্ধা করেন। কিন্তু নতুন বা নিয়মিত কাজ করা অনেক শিল্প নির্দেশকের নামই অজানা থেকে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বড় সমস্যা—পারিশ্রমিক বকেয়া থাকা। তার ভাষায়, অনেক নির্মাতা কাজ করিয়ে সময়মতো টাকা দেন না। সম্পর্কের কারণে বা বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে অনেকেই বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন না। ফলে এই সমস্যা থেকে যায়।

আরেকটি বড় সংকট হলো সংগঠনহীনতা। শিল্প নির্দেশকদের কোনো শক্তিশালী সংগঠন নেই। ফলে তাদের পক্ষে সম্মিলিতভাবে দাবি তোলা বা প্রতিবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে। রবি দেওয়ান মনে করেন, এই অভাবের সুযোগই নেয় কিছু অসাধু মানুষ।

আরও পড়ুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় পড়ার সময় মঞ্চনাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু। তবে পরবর্তীতে তিনি পুরোপুরি ঝুঁকে পড়েন শিল্প নির্দেশনায়। অভিনয় বা নাটকে আর কাজ করেননি। তার চলচ্চিত্রজীবনের শুরু সহকারী শিল্প নির্দেশক হিসেবে। প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’য় সহকারী হিসেবে কাজ করেন তিনি। পরে তারেক মাসুদেরই ‘নরসুন্দর’ চলচ্চিত্রে প্রধান শিল্প নির্দেশক হিসেবে প্রথম কাজ করেন।

তারেক মাসুদের কথা বলতে গিয়ে রবি দেওয়ান আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, তারেক মাসুদ ছিলেন অসাধারণ নির্মাতা। তার সঙ্গে কাজের সুযোগ পাওয়া নিজের জন্য বড় সৌভাগ্যের বিষয়। কাজের ক্ষেত্রে তিনি অনেক স্বাধীনতা দিতেন এবং দুজনের চিন্তা ও রুচির মধ্যে মিল ছিল।

শিল্প নির্দেশনায় তার অনুপ্রেরণার বড় উৎস ভারতীয় প্রখ্যাত শিল্প নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত। ‘পথের পাঁচালী’, ‘চারুলতা’সহ বহু কালজয়ী চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন তিনি। সেই কাজগুলো থেকেই অনুপ্রেরণা পান রবি দেওয়ান। আর সরাসরি তার গুরু ছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্প নির্দেশক তরুণ ঘোষ।

এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০টি চলচ্চিত্রে শিল্প নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছেন রবি দেওয়ান। এর মধ্যে পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য—দুই ধরনের চলচ্চিত্রই রয়েছে। উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে আছে মোরশেদুল ইসলামের ‘প্রিয়তমেষু’, নুরুল আলম আতিকের ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ এবং খন্দকার সুমন পরিচালিত ‘সাঁতাও’ । ২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি পেয়েছে ‘সাঁতাও’।

রবি দেওয়ান বলেন, এই চলচ্চিত্রগুলোতে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার জন্য বিশেষ। নির্মাতারা তাকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন। নিজের কল্পনা ও নান্দনিকতা দিয়ে তিনি চলচ্চিত্রগুলোর দৃশ্যপট নির্মাণ করেছেন।

দেশ-বিদেশে তার কাজ করা অনেক চলচ্চিত্রই পুরস্কার ও স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে বড় কোনো পুরস্কার না পাওয়া নিয়ে তার আক্ষেপ নেই। তিনি মনে করেন, একটি চলচ্চিত্র তার কাছে সন্তানের মতো। সেই চলচ্চিত্র যখন স্বীকৃতি পায়, তখন সেটাই তার বড় প্রাপ্তি।

বর্তমানে তিনি বেশ কয়েকটি নতুন চলচ্চিত্রে কাজ করছেন, যেগুলোর বেশিরভাগই সরকারি অনুদানে নির্মিত। এর মধ্যে রয়েছে ‘অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’, ‘নামহীন গোত্রহীন’, ‘সবুজ পাখি’, ‘মানুষের বাগান’, ‘বাকিটা ইতিহাস’, ‘জীবন আমার বোন’, ‘ফাইল নম্বর ৬০৬’ সহ আরও কয়েকটি ছবি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad