একটি চলচ্চিত্রের পেছনে থাকে গল্প, চরিত্র আর নির্মাতার কল্পনা। কিন্তু ‘অন্যপাতার’ গল্পের সঙ্গে মিশে আছে আরও একটি গল্প—বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা সামলে, নিজেদের উপার্জনের টাকা খরচ করে সিনেমা নির্মাণের স্বপ্ন পূরণ করার গল্প। বুয়েট, চুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেতে যাচ্ছে আসন্ন দুর্গাপূজায়।
এসজেএ প্রোডাকশনের ব্যানারে নির্মিত সিনেমাটির কাজ শুরু হয়েছিল কেবল ছয়জনকে নিয়ে। এরপর একে একে যুক্ত হয়েছেন আরও শিক্ষার্থী। প্রায় দুই বছর ধরে চলেছে এই নির্মাণযাত্রা। পড়াশোনার ব্যস্ততা, সময়ের সীমাবদ্ধতা আর অর্থের জোগান—সবকিছুর সঙ্গে সমন্বয় করেই এগিয়ে নিতে হয়েছে কাজ। টিউশনির আয় ও নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে তারা বাস্তব করেছেন সেই স্বপ্ন, যার শুরুতে ছিল না বড় কোনো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা।
ভর্তি পরীক্ষার অভিজ্ঞতা যখন সিনেমার গল্প
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার লড়াই শুধু একটি পরীক্ষায় ভালো ফল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের প্রত্যাশা, আর্থিক বাস্তবতা, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং জীবনের নানা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। ‘অন্যপাতায়’ এই সময়েরই একটি গল্প বলতে চেয়েছেন নির্মাতারা।
সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রের একজন তরুণ, যে আর্থিক প্রতিকূলতার মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করে। সেই সংগ্রামের পথে তার জীবনে আসে প্রেম। কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে মিষ্টি প্রেমের মেলবন্ধনে এগিয়ে যায় গল্প। বাস্তব জীবনের দুটি ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন সিনেমাটির পরিচালক ও চুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শাহেজাহান এ্যানি।
এ্যানির কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময়টি তরুণদের জীবনের এমন এক অধ্যায়, যার প্রভাব অনেক দিন থেকে যায়। সেই সময়ের টিকে থাকার লড়াই, আবেগ ও অভিজ্ঞতাকে সহজ-সরল গল্পের মধ্য দিয়ে পর্দায় তুলে ধরাই তার উদ্দেশ্য।
সিনেমার পেছনেও রয়েছে আরেক সংগ্রাম
চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহ থাকলেই একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা তৈরি করা যায় না। প্রয়োজন হয় অর্থ, কারিগরি দক্ষতা, পরিকল্পনা এবং দীর্ঘ সময় ধরে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য। শিক্ষার্থীদের জন্য এই চ্যালেঞ্জ আরও বড়, কারণ সিনেমার কাজের পাশাপাশি তাদের সামলাতে হয়েছে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমও।
নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই নির্মাণের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করেছেন তারা। এ যাত্রায় নতুন কাজ শেখার পাশাপাশি নানা বাস্তব সমস্যার মুখোমুখিও হতে হয়েছে। তবে নিজেদের গল্প দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আগ্রহ তাদের কাজ চালিয়ে যেতে সহায়তা করেছে।
চলচ্চিত্রটির দুই প্রযোজক চুয়েটের শিক্ষার্থী অংকন দে অনিমেষ ও বুয়েটের শিক্ষার্থী সামস আবতাহী ইসমাম। তাদের প্রত্যাশা, তরুণদের পরিচিত অভিজ্ঞতা নিয়ে তৈরি হলেও ‘অন্যপাতার’ উপস্থাপনা দর্শকের কাছে নতুন অনুভূতি তৈরি করবে। গল্পের সরলতা, সমকালীন তরুণদের ভাষা ও মিষ্টি কমেডির সমন্বয় সিনেমাটিকে সব বয়সী দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলবে বলে আশাবাদী তারা।
পর্দার প্রতিটি কাজে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ
‘অন্যপাতার’ অভিনয় থেকে শুরু করে চিত্রগ্রহণ, সংগীত, শিল্পনির্দেশনা ও পোস্ট-প্রোডাকশন—বিভিন্ন দায়িত্বে কাজ করেছেন শিক্ষার্থীরা। প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়া শাকিল ও প্রত্যাশা ঘোষ। তাদের সঙ্গে রয়েছেন শাইম, নোমান, অনিমেষ, একুশী, ইমরান, মনন, রোবেনসহ আরও অনেকে।
চিত্রগ্রহণ করেছেন ইব্রাহিম বিন আনছারী। শিল্পনির্দেশনায় ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইন্দ্র নীল। সিনেমার ছয়টি মৌলিক গানের সংগীত পরিচালনা করেছেন ফাহরিয়াজ তাসজিম মনন। আবহসংগীত তৈরি করেছেন আইনান। পোস্ট-প্রোডাকশন ও কালার গ্রেডিংয়ের কাজ করেছেন চুয়েটের শিক্ষার্থী তানভীর জানি। ভিএফএক্সে ছিলেন বুয়েটের শিক্ষার্থী মাসরাফি ইসলাম শাফিন। কাস্টিং পরিচালনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নোমান আহমদ রনি। সংলাপ লিখেছেন বুয়েটের ইশরাক নূর ও চুয়েটের ইকবাল রাফিদ। লাইন প্রোডাকশনের দায়িত্বে ছিলেন উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী সুদীপ্ত পাল।
প্রায় এক ঘণ্টা ৪০ মিনিটের এই চলচ্চিত্রে রয়েছে ছয়টি মৌলিক গান ও আবহসংগীত। চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্যও তুলে ধরা হয়েছে সিনেমায়। সংলাপ ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে বর্তমান প্রজন্মের ভাষা এবং জীবনযাপনের ধরন ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন নির্মাতারা।
এবার অপেক্ষা বড় পর্দার
দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে ‘অন্যপাতাকে’ দর্শকের সামনে আনার কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন নির্মাতারা। ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে সিনেমাটির ঘোষণামূলক পোস্টার, মোশন ভিডিও ও মূল পোস্টার। শিগগিরই প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে আনুষ্ঠানিক ট্রেলার ও মিউজিক ভিডিও।
চার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগের সামনে এখন নতুন পরীক্ষা—প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের কাছে নিজেদের গল্প পৌঁছে দেওয়া। যে গল্প তৈরির পেছনে রয়েছে তাদের সময়, শ্রম, অর্থ ও বিশ্বাস, এবার সেটির সঙ্গে দর্শকের অভিজ্ঞতার মিল কতটা তৈরি হয়, তা জানা যাবে মুক্তির পরই। আসন্ন দুর্গাপূজায় সেই অপেক্ষার অবসান হওয়ার কথা।


