হাসপাতালের লাইসেন্স টিকিয়ে রাখতে বিপুল অঙ্কের টাকা লেনদেন বা ঘুষ দেওয়ার চেষ্টার গুঞ্জনের জবাব দিলেন আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শেখ মহিউদ্দিন।
তিনি বলেন, ‘আমরা মন্ত্রীর পেছনে টাকা নিয়ে ঘুরিনি। ঘুষ দেওয়ার বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে মন্ত্রী মহোদয় নিজে কথা বললেই ভালো হয়।’
এর আগে নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে শনিবার দুপুরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল দাবি করেন, ‘আদ-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে কিন্তু লাভ হয়নি, লাইসেন্স বাতিল করে দিয়েছি।’ তারই জবাবে সোমবার আদ-দ্বীন হাসপাতালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন শেখ মহিউদ্দিন।
আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলকে ‘হাসপাতালের ফাঁসি’ হিসেবে অ্যাখ্যা দেন শেখ মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন যে আমাদের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে। আমি বলি আমার হাসপাতালের ফাঁসি হয়ে গেছে। তবে আমরা একে সম্মান জানাই। মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, এটা দিয়ে আমরা অন্য মেডিকেল কলেজকে শিক্ষা দিচ্ছি। আমাদের হাসপাতালকে শিক্ষা দিয়ে যদি অন্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিবর্তন আনা যায়, তবে আমি খুশি।’
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে সাংবাদিকদের সঙ্গে হাসপাতালের কর্মীদের ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চান তিনি। সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালের এয়ার ভেন্টিলেশনসহ অন্যান্য ত্রুটি সংস্কারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা শুরু করেছেন বলেও জানান।
লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে শেখ মহিউদ্দিন বলেন, সরকারের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে হাসপাতালের ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের জন্য বুয়েট থেকে পাস করা অভিজ্ঞ প্রকৌশলী, সিভিল, কেমিক্যাল ও হেলথ ইঞ্জিনিয়ারদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কারিগরি দল গঠন করা হয়েছে। এই দলের পরামর্শে ইতিমধ্যে শিশু ওয়ার্ডসহ বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডের সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও অক্সিজেন পরিমাপক নতুন যন্ত্র স্থাপন করে পজিটিভ এয়ার প্রেসার নিশ্চিত করা হচ্ছে।
৭২ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতাল থেকে সব রোগী দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সরকারি নির্দেশনার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জীবনশঙ্কার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, হাসপাতালে বর্তমানে মোট ৬০ জন আশঙ্কাজনক রোগী ভর্তি রয়েছেন, যার মধ্যে আইসিইউতে ৫ জন, এনআইসিইউতে ৩৬ জন, শিশু বিভাগে ৬ জন, গাইনি বিভাগে ৯ জন এবং অন্যান্য বিভাগে ৪ জন চিকিৎসাধীন আছেন। বিশেষ করে এনআইসিইউতে থাকা অত্যন্ত কম ওজনের শিশুদের এই মুহূর্তে স্থানান্তর করা হলে মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে বলে মানবিক কারণে তাদের জোরপূর্বক সরানো হয়নি, তবে নতুন কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না।
পুরো ভবনটি হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহারের অনুপযোগী বলে সরকারি তদন্ত কমিটির দাবির সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করে মহিউদ্দিন বলেন, বিষয়টি নিশ্চিত হতে তারা নিজস্ব বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পুনঃপরীক্ষা করছেন এবং প্রতিবেদন সন্তোষজনক হলে তা রেফারেন্স হিসেবে সরকারকে জানানো হবে।
এছাড়া, শিশু মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ হিসেবে ভেন্টিলেশন বন্ধ থাকা ও কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধিকে সরকারি প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করা হলেও তিনি দাবি করেন যে তাদের বিশেষজ্ঞরা এর সঙ্গে একমত নন। তিনি বৈজ্ঞানিক যুক্তি তুলে ধরে বলেন, প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশুরা কম অক্সিজেনে বেশি সময় টিকে থাকতে পারে এবং তাদের কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রতিরোধের ক্ষমতা বেশি, তাই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে উন্নত রাষ্ট্রীয় ফরেনসিক তদন্ত প্রয়োজন।
লাইসেন্স বাতিলের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ চেয়ে সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক।
তিনি জানান, ৩০ দিনের আপিল করার মেয়াদ থাকলেও তারা আগামীকালই সরকারের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন দাখিল করবেন। একই সঙ্গে হাসপাতালের ওপরের তলায় থাকা বেকারীর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে কর্মরত ৮৮ জন কর্মীকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
পাশাপাশি হাসপাতালের নার্স ও আয়াদের অসদাচরণের অভিযোগ স্বীকার করে তাদের জন্য বিশেষ আচরণগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করেন।
গত ২৭ মে ভোররাতে আদ-দ্বীন হাসপাতালের অস্ত্রোপচার পরবর্তী ওয়ার্ডে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) তিন সদস্যের উচ্চ-পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রতিবেদনে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় একাধিক ত্রুটি, পরিবেশগত সমস্যা ও ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক-নার্সদের অবহেলা চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়ার্ডটি নবজাতক বা অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগীদের জন্য উপযুক্ত ছিল না। সেখানে পর্যাপ্ত আলো ও বায়ুচলাচলের অভাব ছিল। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাটি ছিল অপর্যাপ্ত, কাজ করত অনিয়মিতভাবে।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, ঘটনার সময় ওয়ার্ডে কোনো ডাক্তার উপস্থিত ছিলেন না। নবজাতকদের অবস্থার অবনতি হলেও তারা সময়মতো চিকিৎসা পায়নি।


