ফুটবল কখনো কখনো এমন সব গল্প সাজিয়ে দেয়, যা কোনো রূপকথার লেখকও আগে থেকে লিখে রাখতে পারেন না। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামা ২২ বছরের এক তরুণের গোল করার পর সাধারণ প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা বাঁধভাঙা উল্লাস, গ্যালারির দিকে ছুটে যাওয়া কিংবা সতীর্থদের জড়িয়ে ধরে চিৎকার করা।
সুইডেনের হয়ে বিশ্বকাপে নিজের অভিষেক ম্যাচে সোমবার মেক্সিকোর মন্তেরেই স্টেডিয়ামে গোল করেন তরুণ ফরোয়ার্ড ইয়াসিন আয়ারি। সতীর্থরা যখন তাকে জড়িয়ে ধরে উদযাপনে মত্ত, আয়ারি তখন অদ্ভুতভাবে নির্লিপ্ত। জটলার ফাঁক গলে বেরিয়ে দুই হাত উঁচিয়ে গ্যালারির দর্শকদের দিকে তাকালেন। চোখমুখে স্পষ্ট ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গি ফুটিয়ে তিনি সবুজ ঘাসে লুটিয়ে পড়লেন সিজদায়। তার এই নীরবতা আর ক্ষমা প্রার্থনার আসল কারণ লুকিয়ে আছে তার রক্তে। আয়ারি যে দলের জালে বল পাঠিয়েছেন, সেই তিউনিসিয়া তার বাবার দেশ এবং তার নিজের শিকড়।
সুইডেনের সোলনায় জন্ম নেওয়া আয়ারির বাবা তিউনিসিয়ান আর মা মরোক্কান বংশোদ্ভূত। ফলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার সামনে উন্মুক্ত ছিল তিনটি পথ। তিনি সুইডেন, তিউনিসিয়া কিংবা মরক্কো যেকোনো দেশের হয়ে খেলতে পারতেন। ২০২১ সালে আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের সময় তিউনিসিয়ার কোচ আয়ারিকে নিজেদের দলে টানার সরাসরি প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় ফুটবলার বেছে নেন নিজের জন্মভূমিকে।
আর এই সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন তার বাবা আজ্জুজ আয়ারি। তিনি চেয়েছিলেন তার ছেলে যেন সুইডেনের হয়ে খেলে। যে দেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে, বড় করেছে এবং খেয়াল রেখেছে; সে দেশের প্রতি কিছু প্রতিদান দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। বাবার এই ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে ছোটবেলা থেকে সুইডেনের বয়সভিত্তিক দলে খেলেছেন আয়ারি। শৈশব থেকে যে দেশের আলো বাতাসে বেড়ে ওঠা, তাদের প্রতিনিধিত্ব করাটাই তার কাছে সবচেয়ে সহজাত মনে হয়েছে।
২০২২ বিশ্বকাপে জায়গা হয়নি সুইডেনের। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৬ এর বিশ্বকাপে ফেরাটা তাই দেশটির জন্য ছিল বিশেষ এক উপলক্ষ। আর ভাগ্যের পরিহাসে গ্রুপ পর্বের ড্রয়ের দিন দেখা গেল সুইডেনের গ্রুপে পড়েছে তিউনিসিয়া। আয়ারি সেই বিস্ময়ের কথা জানিয়ে বলেছিলেন, তিউনিসিয়া তাদের গ্রুপে চলে আসাটা তার কাছে অবিশ্বাস্য ছিল।
ম্যাচের সপ্তম মিনিটে মাঠের নিয়ন্ত্রণ নেন এই নতুন চেহারার মিডফিল্ডার। সর্বশক্তি দিয়ে নেওয়া এক দুর্দান্ত ভলিতে তিউনিসিয়ার জালে বল ঠেলে দেন তিনি। রক্তের প্রতি টান থেকে গোল করার পর করজোড়ে ক্ষমা চান এবং মুসলিম ফুটবলার হিসেবে সিজদা করেন। তবে ম্যাচের গল্প এখানে শেষ নয়। ৯৫তম মিনিটে তিউনিসিয়ার বিপক্ষে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন আয়ারি। তবে এবার আর নিজেকে আটকে রাখেননি, ভক্তদের সঙ্গে মেতে ওঠেন বাঁধভাঙা উল্লাসে।
তিউনিসিয়া বধের এই ম্যাচে জোড়া গোল করে আয়ারি নাম লিখিয়েছেন রেকর্ডের পাতায়। ২২ বছর বয়সে বিশ্বকাপে সুইডেনের তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ম্যাচে একাধিক গোল করার কীর্তি গড়লেন তিনি। একই সঙ্গে কাই হাভার্টজ ও ফোলারিন বালোগানের পাশে যৌথভাবে আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় বসেছেন তিনি।
সোলনার ঘরের ক্লাব রাসুন্ডার যুব দল থেকে শুরু করে এআইকে, সেখান থেকে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রাইটন সবখানেই আয়ারির পথচলাটা দারুণ। তবে সংখ্যার হিসাব বা রেকর্ডের বাইরেও এই ম্যাচটি আয়ারির জীবনে চিরকাল বিশেষ এক অধ্যায় হয়ে থাকবে। স্কোরশিটে গোল দুটি হয়তো লেখা থাকবে সুইডেনের নামের পাশে। কিন্তু সেই দুই গোলের আবহে আজীবন বেঁচে থাকবে এক তরুণ ফুটবলারের দুই পরিচয়ের টানাপোড়েনের গল্প, যার একটি জন্মভূমির ঋণ এবং অন্যটি নাড়ির টান।


