বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের আকাশে যে কয়েকটি নাম স্থায়ী নক্ষত্রের মতো জ্বলে, আতাউর রহমান তাদের মধ্যে অন্যতম। সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন এই বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। আগামী জুনে তার ৮৫ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো, ১১ মে ছিল আতাউর রহমানের বিবাহবার্ষিকী। রামেন্দু মজুমদার বিষয়টি জানিয়ে বলেন, এই দিনটি আতাউর রহমানের পরিবারের জন্য যেমন আনন্দের হওয়ার কথা ছিল, তা পরিণত হয়েছে গভীর শোক ও বিষাদের দিনে। বিশেষ করে তার স্ত্রী শাহিদা রহমানের জন্য এটি এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি।
তিনি বলেন, ‘গতকালই তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলাম। তিনি জানালেন, বিবাহবার্ষিকীর দিনে লাইফ সাপোর্টে তার স্বামী। মনটা খারাপ হয়েছিলো শুনে। আর আজ কি বলবো। এই শোক আসলে সহ্য করা যায় না। ভালোবাসার বিশেষ দিনে প্রিয় মানুষের বিদায়ের বেদনা আতাউর রহমানের স্ত্রীকে আমৃত্যু বইতে হবে।’
শোক প্রকাশ করে অভিনেতা রওনক হাসান বলেন, “আতাউর রহমান ছিলেন আমাদের অনুপ্রেরণা ও মঞ্চের এক সাহসী পথপ্রদর্শক। তার চলে যাওয়া অপূরণীয় এক ক্ষতি। আজীবন কর্মের মধ্য দিয়েই তিনি এ দেশের মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।”
অভিনয়শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু বলেন, “আমাদের সবার প্রিয় অভিভাবক মঞ্চসারথি আতাউর রহমান আর নেই। আমরা তার বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করছি।”
গত ৮ মে শুক্রবার নিজ বাসায় হঠাৎ পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন আতাউর রহমান। এরপর থেকেই তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। প্রথমে তাকে গুলশানের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়, কিন্তু আইসিইউ শয্যা না পাওয়ায় পরে ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ভর্তির পরপরই তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। শনিবার একবার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হলেও রোববার আবার অবনতি ঘটে এবং পুনরায় লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। দশ দিনের প্রাণান্তকর লড়াই শেষে মঞ্চের এই সারথি চিরতরে নামলেন।
তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বনানী কবরস্থানে মায়ের পাশেই চিরঘুমে শায়িত হন। মৃত্যুকালে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন।
১৯৪১ সালের ১৮ জুন নোয়াখালীর ফেনীতে জন্মগ্রহণ করেন আতাউর রহমান। শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করলেও জীবনের প্রকৃত ঠিকানা হিসেবে বেছে নেন নাটককে।
নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আতাউর রহমান ১৯৭২ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকের মাধ্যমে নির্দেশক হিসেবে আবির্ভূত হন। এরপর ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘রুদ্র রবি ও জালিয়ানওয়ালাবাগ’সহ অসংখ্য কালজয়ী প্রযোজনার নির্দেশনা দিয়েছেন। টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রেও রেখেছেন সমান দক্ষতার ছাপ। লেখক হিসেবেও তিনি সমান সক্রিয় ছিলেন — ‘নাটক করতে হলে’, ‘প্রজাপতি নিবন্ধ’, ‘মঞ্চসারথির কাব্যকথা’সহ নানা গ্রন্থ রচনা করেছেন।
মঞ্চনাটকে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০১ সালে একুশে পদক এবং ২০২১ সালে সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।
মঞ্চের পর্দা নামে, কিন্তু নাটক শেষ হয় না। আতাউর রহমান যে আলো জ্বেলে গেছেন, তা বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনকে পথ দেখাবে বহুকাল।


