নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভির মুক্তিতে অস্বস্তিতে পড়েছে ওসমান পরিবার। আইভির জামিনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার কৌশল নিয়েছে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শামীম ওসমান ও তার ভাতিজার অনুসারীরা।
সপরিবারে দুবাই অবস্থান করা শামীম ওসমান ও ঘনিষ্টরা মনে করছেন, আইভি রাজনীতিতে সক্রিয় হলে এবং নারায়ণগঞ্জ অবস্থান করলে আওয়ামী লীগে তাদের অবস্থান নড়বড়ে হবে। সেজন্য এতদিন নীরব থাকলেও আইভির জামিন ও কারামুক্তির খবরে তারা হঠাৎ ঝটিকা মিছিল করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার পরিকল্পনা করছে।
নারায়নগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, শামীম ওসমান আর রাজনীতিতে ফিরছেন না। দলের নেতাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই। তিনি দুবাইয়ে পরিবার নিয়ে ঘুরেফিরে সময় কাটাচ্ছেন। শামীম ওসমানের বড় ভাই প্রয়াত নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরি ওসমান বিদেশে থেকে দেশে সক্রিয় হওয়ার পথ খুঁজছেন।
তারা আরও জানান, গত এক সপ্তাহে আজমেরির অনুসারীরা বিভিন্ন পয়েন্টে একাধিক ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা করলে গোয়েন্দারা এর সঙ্গে আইভির জামিনের যোগসূত্র পেয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন এমন একাধিক ব্যক্তি টাইমস অব বাংলাদেশকে এমন তথ্য জানিয়ে বলেছেন, ওসমান পরিবার কোনোভাবেই আইভিকে সহ্য করবে না। স্থানীয় পুলিশ গোয়েন্দাদের কাছেও এমন খবর রয়েছে।
কারাগার থেকে ১৩ মাস পর মুক্ত হয়ে নিজ বাসায় ফিরেছেন আইভি। বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিজ বাসা চুনকা কুটিরে ফেরেন তিনি। জামিনে মুক্তি পেয়ে রাত ১০টা ১০ মিনিটের দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে বের হন আইভি। সরাসরি যান নারায়ণগঞ্জের মাসদাইরে কেন্দ্রীয় সিটি কবরস্থানে। সেখানে তিনি বাবা-মা ও ছোট ভাইয়ের কবর জিয়ারত করেন।
২০২৫ সালের বছরের ৯ মে পোশাকশ্রমিক মিনারুল হত্যা মামলায় আইভিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে আরও ৯ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
ওসমান পরিবারে অস্বস্তি
নারায়ণগঞ্জের একাধিক আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ সমর্থক দাবি করেছেন, স্থানীয় রাজনীতিতে শামীম ওসমান নানা কারণে সমালোচিত। অন্যদিকে, অনেকটা ক্লিন ইমেজের জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত আইভি। তার মুক্তিতে সমর্থক ও অনেক সাধারণ মানুষ খুশি হলেও শামীম ওসমানের অনুসারীরা বেজায় নাখোশ।
ওসমান পরিবার অনুমান করছে, আওয়ামী লীগে আগামীর নেতৃত্ব এবং কর্তৃত্ব আইভির হাতে। এজন্য কোনো মামলায় জামিন হলেই নারায়ণগঞ্জে শামীম অনুসারীদের ঝটিকা মিছিল বের হয়। আর এটাকে জামিন আটকে দেওয়ার পাঁয়তারা হিসেবে দেখছেন আইভি অনুসারীরা।
বুধবার রাতে কারামুক্তি খবরে নারায়ণগঞ্জে মিছিল করার প্রস্তুতি ছিল–এমন খবর ছিল পুলিশ ও গোয়েন্দাদের কাছে। এজন্য আইভি অনুসারীদের সতর্ক করেছিল প্রশাসন। আইভি ছাড়া পেলে মিছিল হলে ফের বেকায়দায় পড়বেন এমন পরিকল্পনা ছিল ওসমান অনুসারীদের।
আইভির ঘনিষ্ট একাধিক ব্যক্তি টাইমসকে বলেছেন, ‘আইভির জামিন যাতে আটকে যায় ও কারামুক্তি ঠেকাতে শামীম ওসমান আদালতে সব ধরনের চেষ্টা তদবির করেন। এজন্য তিনি একাধিক আইনজীবীর সহায়তা নিয়েছেন।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শামীম ওসমান টাইমসকে বলেছেন, ‘আইভি ছাড়া পেয়ে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। যে বিচার বিভাগ বঙ্গবন্ধু কন্যাকে ফাঁসির দণ্ড দিয়েছে, সেই বিচার বিভাগকেই কারামুক্তির পর তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।’
শামীম ওসমান বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে নিয়মিত মিছিল হয়, সারা দেশে হচ্ছে। এখানে আইভিকে বিপাকে ফেলার প্রশ্ন আসবে কেন। আমি সবার মতোই তার ভালো চাই। দেশের মঙ্গল চাই।’
আইভির আক্ষেপ
কারামুক্তির পর আইভি তার ঘনিষ্টদের সামনে আক্ষেপের সুরে বলেছেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নারায়ণগঞ্জে দলের সব নেতারা পালিয়ে গেছে, আমি পালাইনি। কারণ, আমি কোনো অন্যায়-অপরাধ করিনি। তারপরেও জেলে যেতে হয়েছে। দল ক্ষমতায় থাকতে শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে দলে বিচার চেয়ে পাইনি। রাজনীতি করতে গেলে মাস্তান পালতে হয়, আমার পক্ষে তা সম্ভব না।’
এর আগে তিনি বলেন, ‘আমি চাই সবাইকে নিয়ে মানবিক সরকার গঠিত হোক। জেলে আমার মতো আরও মায়েরা আছেন, তারা নিরপরাধ। আশা করি, সরকার তাদের প্রতিও সদয় হবে।’
নাখোশ বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা
নাসিকের সাবেক মেয়র আইভি ফের প্রার্থী হতে পারেন এমন গুঞ্জন রয়েছে। এজন্য তার (আইভি) কারামুক্তিতে খুশি হতে পারছেন না স্থানীয় বিএনপির তিন নেতা ও তাদের অনুসারীরা।
এই তিনজন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থী হতে চান। তাদের ঘনিষ্টরা মনে করছেন, ক্লিন ইমেজের আইভি জনপ্রিয়। কারাগারের যাওয়ায় তার জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। এ অবস্থায় তাকে ভোটে হারানো কঠিন হতে পারে।
বিএনপির একাধিক নেতা টাইমসকে জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শাখাওয়াত হোসেন খান, বিএনপির সদস্য সচিব আল ইউসুফ খান টিপু ও নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েও সরে দাঁড়ানো প্রার্থী মো. মাসুদুজ্জামান মাসুদ মেয়র পদে প্রার্থী হতে চান। নানাভাবে তারা প্রচারণায় আছেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় আইভি প্রার্থী হলে বিএনপির যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে তাকেই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। অবশ্য এ নিয়ে ওই তিন নেতা কোনো মন্তব্য করতে আগ্রহ দেখাননি।


