চট্টগ্রামের ফয়’স লেকের পাশে অবস্থিত চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। প্রতিষ্ঠার ৩৭ বছর পেরিয়ে গেলেও ১০ দশমিক দুই একর জমির এই চিড়িয়াখানাটি এখনো অবকাঠামোগত সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ৫২০টি প্রাণীকে সীমিত জায়গায় রাখায় প্রশ্ন উঠেছে প্রাণী ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা ও প্রাণী কল্যাণ নিয়ে। এর মধ্যেই চিড়িয়াখানাটিকে আন্তর্জাতিক মানের সাফারি পার্কে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় বর্তমানে ৬৬ প্রজাতির ৫২০টি প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে স্তন্যপায়ী ৩০ প্রজাতি, পাখি ৩৮ প্রজাতি এবং সরীসৃপ রয়েছে ছয় প্রজাতির। এত বিপুলসংখ্যক প্রাণীর জন্য ১০ দশমিক দুই একর জায়গা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

বিশেষ করে চিড়িয়াখানার ১৭টি বাঘ এবং ২০ থেকে ৩০টি হরিণের জন্য জায়গার সংকট প্রকট। প্রাণীগুলোর স্বাভাবিক চলাচলের জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা নেই। বাংলাদেশি আইন অনুযায়ী, একটি হরিণের জন্য অন্তত চার গণ্ডা বা প্রায় শূন্য দশমিক এক একর জায়গা প্রয়োজন। দুটি হরিণের জন্য প্রয়োজন আট গণ্ডা। বাস্তবে অনেক হরিণকে এর চেয়ে অনেক কম জায়গায় রাখতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেছেন, বছরের পর বছর শুধু মানুষের বিনোদনের জন্য প্রাণীকে খাঁচায় বন্দী করে রাখা অন্যায়। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা সম্ভব না হলে প্রাণীগুলোকে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়াই ভালো।
ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানা যেখানে প্রতিবছর সরকারের কাছ থেকে ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ পায়, সেখানে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা পরিচালিত হয় নিজস্ব আয়ে। দর্শনার্থীদের টিকিট বিক্রিই এর প্রধান আয়ের উৎস।
১৯৮৯ সালে চিড়িয়াখানা চালুর সময় টিকিটের মূল্য ছিল মাত্র এক টাকা। কয়েক দফা বাড়ানোর পর বর্তমানে টিকিটের মূল্য ৭০ টাকা। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, মাসে গড়ে আয় হয় প্রায় ৬০ লাখ টাকা। বিপরীতে প্রাণীদের খাবার ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয় প্রায় ২৫ লাখ টাকা। ২৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বাবদ ব্যয় হয় আরও প্রায় সাত লাখ টাকা।
চিড়িয়াখানাটি বর্তমানে লাভজনক হলেও এই আয় দিয়ে বড় ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ বা আধুনিকায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

চিড়িয়াখানার কিউরেটর শাহাদাত হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক মানের একটি বাঘের খাঁচা বা এনক্লোজার নির্মাণেই প্রায় দুই থেকে দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রয়োজন। বড় পরিসরে সংস্কার বা উন্নয়ন করতে হলে সরকারি অর্থায়ন ছাড়া তা সম্ভব নয়।
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার অন্যতম আকর্ষণ বিরল সাদা বাঘ। তবে বিশেষজ্ঞ ও চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের মতে, এসব বাঘের বংশবিস্তারের ক্ষেত্রে অন্তঃপ্রজননের ঝুঁকি রয়েছে।
বিদেশ থেকে বাঘ আমদানির সময় অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ জেনেটিক রেকর্ড পাওয়া যায় না। ফলে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় প্রাণীর মধ্যে প্রজননের ঘটনা ঘটতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে বাঘের বিভিন্ন শারীরিক ও জেনেটিক জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রাণীদের চিকিৎসার জন্য চিড়িয়াখানায় সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র দু’জন। একই সঙ্গে ৫২০টি প্রাণীর দেখভালের জন্য ২৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে এত বড় প্রাণী সংগ্রহশালা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
কিউরেটর শাহাদাত হোসেন বলেন, শুধু চিকিৎসক বা কর্মী বাড়ালেই এই সংকটের সমাধান হবে না। মূল সমস্যা জায়গার। প্রাণীদের উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ ও চলাচলের সুযোগ না থাকলে শুধু চিকিৎসা দিয়ে তাদের সুস্থ ও প্রাণবন্ত রাখা সম্ভব নয়।
সংকটের মধ্যেই চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানাকে আন্তর্জাতিক মানের সাফারি পার্কে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সোমবার চিড়িয়াখানা পরিদর্শনে গিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, চিড়িয়াখানার পাশের পতিত জমি এবং ফয়’স লেকের আশপাশের পাহাড়ি এলাকা প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। এরই মধ্যে অতিরিক্ত আট একর জমি চিড়িয়াখানার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ চলছে। এতে মোট আয়তন বেড়ে ১৮ একর হবে।
নতুন মহাপরিকল্পনায় খাঁচাভিত্তিক প্রদর্শনের বদলে উন্মুক্ত প্রদর্শনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেখানে বাঘ, সিংহ, জেব্রা, ক্যাঙ্গারু ও ওয়াইল্ডবিস্টের মতো প্রাণী পাহাড় ও বনঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে বিচরণের সুযোগ পাবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক যাদব কুমার বিশ্বাস বলেন, সাফারি পার্ক মূলত বড় পরিসরের খাঁচাবিহীন চিড়িয়াখানা। ডুলাহাজরা ও গাজীপুরের সাফারি পার্কের মতো এখানে প্রাণীদের জন্য বড় পরিসরের জায়গা থাকে। দর্শনার্থীরা গাড়িতে করে প্রাণীদের কাছাকাছি গিয়ে তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশে দেখতে পারেন।
তার মতে, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার আয়তন বাড়িয়ে সেটিকে সাফারি পার্কে রূপান্তর করা হলে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ হবে।
১৯৮৯ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক এম এ মান্নানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। ৩৭ বছর পর এসে প্রতিষ্ঠানটি এখন আধুনিকায়নের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রাণীদের খাঁচাবন্দী জীবন থেকে বের করে তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত ও বড় পরিসরে সরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


