প্রেশার গ্রুপ নাম দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে পুলিশি নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
ঢাকার সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে শনিবার আয়োজিত ‘অভ্যুত্থান-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়: সাম্প্রতিক বাস্তবতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক থেকে শিক্ষক নেটওয়ার্ক এ দাবি করে।
বক্তারা বলেন, ‘জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের নামে একদিকে প্রহসন চলেছে, অন্যদিকে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে পুলিশি নীতিকে অন্তর্বর্তী সরকার প্রশ্রয় দিয়েছে। ফলে, একদিকে আমরা দেখেছি মবের শিকার হয়ে হত্যার বিচারে স্থবিরতা আর অন্যদিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর নতুন করে আক্রমণকারী শক্তি হিসেবে নির্বাচিত শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের আবির্ভাব।’
বক্তারা বলেন, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপাদান ছিল ভয়ের সংস্কৃতি, যে সংস্কৃতির সূতিকাগার ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো। আবাসিক হলের গণরুম-গেস্টরুমের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভিন্নমত দমনের প্রধান মঞ্চ হয়ে উঠেছিল ক্যাম্পাসগুলো। ফ্যাসিবাদী সেই ভয়কে প্রতিরোধ করেই গড়ে উঠেছিল জুলাইয়ের বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার বোধ। তবে, নির্মম বাস্তবতা হলো, ৫ আগস্ট হাসিনা-পলায়ন পর্ব শেষে জুলাইয়ের ঐক্য নানাভাবে বিনষ্ট হয়েছে, যার ঢেউ ক্যাম্পাসগুলোতে এসেও লেগেছে। নিপীড়নের পুনরাবৃত্তি শুরু হয়েছে এবং প্রতিরোধের শক্তি বিভক্ত ও দুর্বল হয়েছে।
আলোচকেরা বলেন, অন্তর্বর্তী শাসনামলে সরকারি ক্ষমতার প্রশ্রয়ে ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসগুলোতে সহিংসতার সংস্কৃতি পুনরায় জায়গা করে নেয়। সারাদেশে ভাস্কর্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মারকচিহ্ন ভাঙচুর, ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বাড়ির ওপর দফায় দফায় হামলা, দেশের গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়া হাউজ এবং প্রথিতযথা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এসবের নেতৃত্ব দিয়েছে অভ্যুত্থানের একক কৃতিত্বের দাবিদার বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা, যাদের বেশির ভাগই আবার মব সহিংসতা করার সময় ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ বা ‘তৌহিদী জনতা’ নাম ধারণ করে। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে চারজন নাগরিককে, যাদের মধ্যে জাবি ও রাবির দুইজন ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী। এছাড়া, ঢাবির একজন ছাত্রদল নেতা নিহত হয়েছেন। শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের শিক্ষার্থীরা হেনস্থা করেছে, শারীরিক আক্রমণ করেছে, ‘মব’ করে বের করে দিয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে।
ইউনূস সরকারের ১৮ মাসে শিক্ষাঙ্গনগুলো ভয়ের সংস্কৃতির নতুন স্তরে প্রবেশ করেছিল উল্লেখ করে শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলে, রাজনৈতিক দলের লেজুড় নয় এমন দাবিকারী ছাত্রশিবির ক্যাম্পাস আটকে বাকীদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। এর ফল তারা পেয়েছে হাতে হাতে—অধিকাংশ শিক্ষার্থী সংসদ তাদের দখলে গিয়েছে। তবে শিক্ষার্থী সংসদ দখলের সঙ্গে সঙ্গে তারা যেভাবে ‘মব’ করতে শুরু করেছিল, তা আমাদের দেখিয়েছে বিচারের নাম দিয়ে, সংঘবদ্ধ সহিংসতাকে কীভাবে বৈধতা দিতে হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের অহমিকায় ও জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি করতে গিয়ে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোতে হামলা ও আক্রমণে শিক্ষার্থী সংসদের নেতারা সোল্লাসে অংশ নিয়ে সহিংসতায় ভূমিকা রেখেছেন। উদীচী ও ছায়ানটের ওপরে হামলার ডাক এসেছে রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত শিক্ষার্থী সংসদ নেতাদের কাছ থেকে। এসব ঘটনা সচেতন মহলে ভয়াবহ উদ্বেগ ও আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের দাবি, বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনগুলো অন্তর্বর্তী আমলে যেমন মবের মুল্লুকে পরিণত হয়েছিল, তা নির্বাচিত সরকারের আমলে খুব বেশি পাল্টেছে বলে মনে হয় না। নির্বাচিত সরকারের আমলে ইমির ওপর ডাকসু নেতাদের আক্রমণ, শাহবাগে চা-পানরত নাগরিকদের ওপর আজাদী মঞ্চের আক্রমণ, ডাকসু নেতাদের ওপর ছাত্রদলের আক্রমণ, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের আভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দলের ফলে সৃষ্ট উত্তেজনা এবং সর্বশেষ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীকে রাতের অন্ধকারে ক্যাম্পাসে ভয়াবহ ধর্ষণচেষ্টার প্রেক্ষিতে প্রশাসনের দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকা এবং প্রতিবাদে সৃষ্টি হওয়া আন্দোলনকে প্রভাব বিস্তারকারী দুই ছাত্র সংগঠনের তরফে বিভাজনের অপচেষ্টা আমাদের শঙ্কাকে আরো বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে।
গোলটেবিল আলোচনায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোর পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। বক্তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান শিক্ষা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচিত শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের মবের উস্কানি, নারী শিক্ষার্থীদের প্রতি নিপীড়ন, ধর্ষণ ও সাইবার বুলিং, হল ও ক্যাম্পাস দখলের পুরোনো সংস্কৃতি, প্রশাসনিক পদকর্তা ও শিক্ষক নিয়োগে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারগুলোর দলীয়করণের ভূমিকা এবং সামগ্রিকভাবে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার অবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এছাড়া, গোলটেবিল আলোচনা থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টা বিরোধী আন্দোলনের প্রতি সংহতি জ্ঞাপন করা হয়।
গোলটেবিলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া সিকদার, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার শিক্ষার্থী জারিন তাসমিন পুষ্প এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা আব্দুল কাদের। শিক্ষকদের মধ্যে আলোচনা করেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) মারিয়া ভুঁইয়া, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ণয় ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মামুন হায়দার, উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্যামা ভট্টাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের (ইউল্যাব) অলিউর সান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধীমান সরকার, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের লায়েকা বশীর, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাসির আহমেদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রুশাদ ফরিদী, অধ্যাপক কামাল উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী ও ইউজিসির সাবেক সদস্য অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষে অবস্থানপত্র তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুশাদ ফরিদী। গোলটেবিল আলোচনাটি সঞ্চালনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফা।
অধ্যাপক কাজী মামুন হায়দার বলেন, অনলাইনে মব দিয়ে সমর্থন অর্জন করে, ফিজিকাল স্পেসে অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছে ক্যাম্পাসে।
অধ্যাপক কামাল উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির শিক্ষক হিসেবে বলতে পারি যে, যারা নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের মধ্যে একটা হতাশা, লজ্জা, অপরাধবোধ কাজ করেছে। আমার প্রস্তাব, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন নিপীড়িত শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি করা হয়েছে। নিপীড়ন শুধু শারীরিক বা মানসিকভাবেই হয়নি, নিয়োগেও নিপীড়ন করা হয়েছে। পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন আগেই ফাঁস করা হয়েছে।


