নতুন টাকা, নতুন জামা, সুস্বাদু ফল আর এক বিশ্বস্ত কোল। ঈদের আনন্দ কেমন হতে পারে, তার এক নিঃশব্দ অথচ গভীর চিত্র ফুটে উঠেছে চট্টগ্রামের রউফাবাদ এলাকার সরকারি ছোটমনি নিবাসে।
শনিবার ঈদের সকালে সেখানে উপস্থিত হন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা, যিনি ‘মানবিক ডিসি’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। আনুষ্ঠানিকতা পাশে রেখে তিনি শিশুদের মাঝে মিশে যান একেবারে আপনজনের মতো। সঙ্গে ছিল নতুন জামা, ফলমূল ও ঝকঝকে নতুন নোট-ঈদের উপহার।
প্রথমে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে তাকিয়ে থাকলেও, ধীরে ধীরে শিশুরা তার কাছে এগিয়ে আসে। কেউ হাত বাড়ায়, কেউ লাজুকভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ঈদের সালামি। ছোট ছোট হাতে ধরা নতুন নোট যেন শুধু টাকা নয়, বরং তাদের অস্তিত্বের এক স্বীকৃতি-তাদেরও ঈদ আছে।
তবে দিনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি তৈরি হয় যখন জেলা প্রশাসক নিজ হাতে শিশুদের কোলে তুলে নেন। একটি ছোট শিশুকে কোলে নিয়ে স্নেহে আগলে রাখেন তিনি। কিছুক্ষণ পর আরেকটি শিশুকেও কোলে নেন ফেনীর সোনাগাজী মডেল থানা এলাকার একটি মানব পাচার মামলায় উদ্ধার হওয়া দুই মাস বয়সী ইয়াসীন। দুটি শিশুকে বুকে জড়িয়ে রাখার সেই দৃশ্য উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।
এই শিশুদের জীবনের গল্প ভিন্ন হলেও তাদের বেদনা একই। মানব পাচার মামলার ভিকটিম ইসরাত জাহান রক্সির সন্তান ইশা আক্তারকে গত বছরের ১ জুন আদালতের মাধ্যমে এই নিবাসে রাখা হয়। ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট জন্ম নেওয়া এই শিশুটি তার জন্মদাতার পরিচয় জানে না। অন্যদিকে, ইয়াসীনও মাত্র দুই মাস বয়সে অনিশ্চয়তার অন্ধকার থেকে উদ্ধার হয়ে এখানে আশ্রয় পেয়েছে।
ছোটমনি নিবাসের অফিস সহকারী নূর জাহান বলেন, ‘অনেকেই এখানে আসেন, কিন্তু এভাবে সময় দেন না। ঈদের দিন নিজের পরিবার ছেড়ে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো—এটা আমরা আগে দেখিনি।’
এ সময় অন্য শিশুরা নতুন জামা হাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে—কেউ খুলে দেখছে, কেউ পরার জন্য উদগ্রীব। টেবিলে সাজানো ফল আর চারপাশে উৎসবের আবহ থাকলেও, কোথাও যেন লুকিয়ে থাকে এক নীরব প্রশ্ন—‘আমার আপনজন কোথায়?’
চট্টগ্রামের এই ছোটমনি নিবাসে বর্তমানে ১৬ জন শিশু রয়েছে। অনিশ্চয়তা দিয়ে শুরু হলেও এখানে তারা নতুন করে বাঁচতে শিখছে যত্ন, শৃঙ্খলা আর ভালোবাসার ছায়ায়।


