খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধায় চির বিদায় জানালেন সর্বস্তরের মানুষ। শনিবার বৃষ্টিস্নাত সকালে শিক্ষার্থীবান্ধব অধ্যাপকের মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে নেওয়া হয়। প্রিয় শিক্ষককে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় করেন হাজারও শিক্ষার্থী।
এরপর বেলা ১১টার দিকে মনজুরুল হকের মরদেহ নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে সেখানে ভিড় জমান বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
অধ্যাপক মনজুরুল ইসলামকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘মনজুর আমার ছাত্র ছিলেন, পরে সহকর্মী হয়েছেন। ছাত্রজীবনেই তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন। নানা গুণে গুণান্বিত মনজুরকে শিক্ষক হিসেবে যেমন তার শিক্ষার্থীরা ভালোবাসতো, তেমনি বাংলা সাহিত্যেও তিনি অনবদ্য অবদান রেখেছেন।’
অন্যান্যের মধ্যে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান পরিবেশ উপদেষ্টা হলেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘মনজুর ভাই আমাদের মাঝ থেকে চলে গেছেন। শিক্ষক, লেখক, বিশ্লেষক হিসেবে তিনি ছিলেন আমাদের দিকনির্দেশক। ব্যক্তিগতভাবেও তিনি খুব আপন ছিলেন।’
আসিফ নজরুল বলেন, ‘স্যারের বাসা ছিল আমার পাশেই। উনি দেখলেই হাসতেন, খুব মন জুড়ানো হাসি। আমি সবসময় মনে করেছি, এভাবে হাসতে পারে সেই মানুষ, যার হৃদয় খুব পরিষ্কার। স্যার ছিলেন অসম্ভব জ্ঞানী এবং ভীষণ জনপ্রিয় একজন শিক্ষক।’

একে একে মনজুরুল ইসলামকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস, আর্কাইভ ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, ছায়ানট, জাসদ, বাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।
আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাবির কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান, ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাজিন আজিজ চৌধুরী, ইংরেজি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুর ১টায় তার মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নেওয়া হয়। সেখানে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।
গত ৩ অক্টোবর ধানমন্ডিতে ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা জানান, তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন এবং তার হৃদযন্ত্রে রিং পরানো হয়েছে। তবে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় গত শুক্রবার বিকেল ৫ টায় তিনি মারা যান।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ১৯৫১ সালের ১৮ জানুয়ারি সিলেট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে আইরিশ কবি ডব্লিউ বি ইয়েটসের ওপর গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি নেন।
দীর্ঘদিন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনায় যুক্ত ছিলেন। অবসরের পর ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে শিক্ষকতা শুরু করেন। কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক হিসেবে তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নাম।


