সরকারের ‘এক্সিট পলিসি’র সময় হয়েছে: দেবপ্রিয়

সরকারের ‘এক্সিট পলিসি’র সময় হয়েছে: দেবপ্রিয়
বুধবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত একটি গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন ও আলোচনা সভা। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস
Advertisement
Advertisement

একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ‘এক্সিট পলিসি’গ্রহণ করার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) এর সন্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার নির্মোহ না হলে সমস্যা। বেশি সময় থাকলে স্বার্থের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তখন আরও বেশি সময় থাকতে চায়। বর্তমান সরকারের কার্যাবলিকে আগামী নির্বাচিত সরকার এসে বৈধতা দেবে কি না, এই সরকারের এখন সেটা ভাবার সময় এসেছে। এক্সিট পলিসি নেওয়ার সময় চলে এসেছে।’

বুধবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত একটি গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন ও আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।

সভায় ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণ, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ ও সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন: বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষিত’ শীর্ষক গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন করেন ডেমোক্রেসি ডায়াস বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন।

এ সময় রাজনীতিবিদদের সতর্ক করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, ‘সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করলে তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা অন্তর্বর্তী সরকার চলে আসে। এই দায় রাজনীতিবিদদের। আবার এর কারণে সবচেয়ে ভুক্তভোগী হন রাজনীতিবিদরাই।’

অনুষ্ঠানে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান বলেছেন, ‘ব্যাপক সংস্কারের অধিকার শুধু নির্বাচিত সরকারের আছে। অন্তবর্তী সরকার কাজ করবে শুধু অতি জরুরি অত্যাবশ্যকীয়তার ওপর ভিত্তি করে। আজই নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হলে, কাল থেকে নৈরাজ্য থাকবে না, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটা শৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসবে। দেশ উৎসবমুখর হয়ে উঠবে। মানুষের ইচ্ছা পূরণে যত বিলম্ব হবে, তত সমস্যা বাড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো যদি দেশের মানুষের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাহলে গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। দেশের স্থিতিশীলতার জন্য সবসময় রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন।’

নির্বাচনে পিআর সিস্টেমের প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘পৃথিবীর কিছু দেশে পিআর সিস্টেম আছে, তবে সেসব দেশ ও বাংলাদেশের প্রেক্ষিত এক নয়। এদেশের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের মনস্তত্ত্ব আলাদা। এদেশের মানুষ একটি দলকে এবং প্রার্থীকে ভোট দেয়। অথচ পিআর একটা নৈর্ব্যত্তিক প্রক্রিয়া। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পিআর সিস্টেম যায় না। আমেরিকাতে ২৫০ বছরের গণতন্ত্র কিন্তু পিআর সিস্টেম প্রতিষ্ঠিত হয়নি।’

আরও পড়ুন

এ সময় প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হোসেন বলেন, ‘যে দেশে আইন থাকে, সেখানে মব থাকে না। অন্তর্বর্তী সরকার নীরব থেকে মব ভায়োলেন্স উসকে দিয়েছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কিছুই দিতে পারেনি। রংপুরের গঙ্গাচড়ায় সংখ্যালঘু নিপীড়নের ঘটনায় এই সরকারের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা চোখে পড়েনি। এতদিন মনে হয়েছিল, শুধু বিএনপি চাঁদাবাজিতে যুক্ত। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এনসিপি ও জামায়াতও একই কাজে লিপ্ত।’

তিনি আরও বলেন, ‘পিআর পদ্ধতিতে দেশের মানুষ অভ্যস্ত নয়। পিআর না হলে আবারও শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে এই যুক্তি ঠিক নয়। এখানে পদ্ধতি কোনো বিষয় নয়। মূল বিষয় মানসিকতা, এটা বদলাতে হবে।’

যুগান্তরের সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার বলেন, ‘নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার জন্য যেসব তত্ত্ব আনা হচ্ছে, পিআর তেমনই একটা বিষয়। দেশের মূল ভোটার যারা, গ্রামের সাধারণ মানুষ, পিআর কী তারা সেটাই জানে না। এনজিওর ট্রেনিং দিয়ে রাষ্ট্র চলে না।’

বুধবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত একটি গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন ও আলোচনা সভা। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস

বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে অনেক বেশি সময় দেওয়া হয়ে গেছে। প্রথম দুই-তিন মাস যে অবস্থা ছিল, এখন ইউনূস সরকারের অবস্থা তা না। ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ-সবাই বুঝে গেছে, এই সরকার বেশিদিন থাকলে দেশের অর্থনীতি ঠিক থাকবে না।’

গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, ’আমরা এখনো জানি না যে-এই সরকারের লক্ষ্য কী, উদ্দেশ্য কী? কয়েকজন উপদেষ্টা ও তাদের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। মুহাম্মদ ইউনূসের নিয়োগকর্তারা যতক্ষণ না তাকে নির্দেশ দেবেন, তিনি ততক্ষণ নির্বাচন দেবেন না। আমরা তাকে বিশ্বাস করে ভুল করেছি।’

রাজনীতি বিশ্লেষক ড. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘এই দেশ অনেক ভালোভাবে চালানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু এই সরকার অত্যন্ত খারাপভাবে দেশ চালিয়েছে। এই সরকার নিরপেক্ষ না। যে সরকার নিরপেক্ষ না, সেই সরকার কেন দীর্ঘসময় থাকবে?’

সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, ‘যে সরকার নিজেদের মধ্যে সংস্কার করতে পারেনি, তারা দেশের কী সংস্কার করবে? এই সরকারের কোনো জবাবদিহিতা নেই। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ হয়ে উঠতে লেগেছে ১৫ বছর। এই সরকারের লেগেছে ১১ মাস। মবোক্রেসি দিয়ে মানুষের কণ্ঠ রোধ করে দিয়েছে। সংস্কারের নামে শুধু সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্ত ১৭ জন ব্যক্তি বিদেশের নাগরিক। তারা তো দেশেই থাকবেন না। তারা দেশের ভালো কী বুঝবে? আগে বিদেশি তাড়ান। পরে দেশের সংস্কার দেশের মানুষ করবে।’

গবেষণা ফলাফল উপস্থাপনের সময় আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে, তখন তা নিজেই একটা সঙ্কটের জন্ম দেয়। দীর্ঘ এক বছরেও দেশের অন্তর্বর্তী সরকার কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংস্কার সম্পন্ন করতে পারেনি। বাংলাদেশে এখন একটি ভঙ্গুর পরিস্থিতি বিদ্যমান।’

গবেষণায় দেখানো হয়, বিগত ৫০ বছরে বিশ্বজুড়ে ২৬টি দেশে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। এর মধ্যে ১৬টি দেশে দ্রুততম সময়ে নির্বাচন হয়েছে, এই দেশগুলোতে নির্বাচন আয়োজনের সময়কাল ছিল গড়ে ১০ মাস ২১ দিন। এর মধ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে ১০টি দেশে দীর্ঘমেয়াদে অন্তর্বর্তী সরকার পরলিক্ষিত হয়েছে। নির্বাচন বিলম্বের কারণে সেসব দেশে সামাজিক অসন্তোষ, চরম অস্থিরতা, ও মানবিক বিপর্যয় দেখা গেছে।’

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিষয়ে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ৬৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এভাবে চলতে তাকলে ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে নতুন করে আরও ১১৭টি কারখানা বন্ধ হবে। দারিদ্র্যের হার ২০২৪ সালের ২০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে হয়েছে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০২৬ সালে ২৫ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছাবে। গত এক বছরে বেকারত্ব বেড়েছে প্রয় ৪ লাখ। গ্যাস উৎপাদন কমেছে এক তৃতীয়াংশ, তথা ৯৫ কোটি ঘনফুট। এফডিআই কমেছে ৩০ কোটি ৩০ লাখ ডলার। মুখ থুবড়ে পড়েছে স্বাস্থ্য খাত। বেড়েছে ধর্ষণ, মব ভায়োলেন্স। গত বছরের আগস্ট থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খুন হয়েছে ২ হাজার ১৩৫ জন। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ এসব সংখ্যা অন্তত তিনগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মাহবুব উল্লাহ, আবু আহমেদ, এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, দ্য ফিন্যান্সিয়াল পোস্টের সম্পাদক এমএ আজিজ, বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দীন টুকু, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন রাজী, রেজাউল করিম রনি প্রমুখ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad