যমুনা সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ করল ইঁদুর

যমুনা সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ করল ইঁদুর
যমুনা সার কারখানা। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

রাষ্ট্রায়ত্ত যমুনা সার কারখানায় ইঁদুরের কামড়ে বৈদ্যুতিক তার কেটে গিয়ে পুরো কারখানা অচল হয়ে পড়েছে। এমন ঘটনা শুধু অদ্ভূত নয়, বরং শিল্প নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বুধবার গভীর রাতে কারখানার পাওয়ার প্ল্যান্টে শর্ট সার্কিট হয়ে হঠাৎ ব্ল্যাকআউট দেখা দিলে বন্ধ হয়ে যায় ইউরিয়া উৎপাদন।

কারখানা সূত্র বলছে, রাত ১টার দিকে পাওয়ার প্ল্যান্টের বৈদ্যুতিক লাইনে ইঁদুর ঢুকে তার কেটে দিলে শর্ট সার্কিট হয়। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া থেমে যায়।

কারখানার জিএম অপারেশন মো. ফজলুল হক বলেন, ‘মধ্যরাতে পাওয়ার প্ল্যান্টে ইঁদুর ঢুকে তার কেটে দিলে শর্ট সার্কিট হয়ে পুরো কারখানায় ব্ল্যাকআউট হয়। দ্রুত মেরামত কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে শনিবার নাগাদ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।’

যমুনা সার কারখানা দেশের বড় ইউরিয়া উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। কৃষি মৌসুমে এ কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়া মানেই সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়া। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে সার সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই, তবে ঘন ঘন উৎপাদন বিঘ্ন শিল্প ব্যবস্থাপনায় আস্থার সংকট তৈরি করছে।

কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ ২৩ মাস কারখানায় তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকার পর গত বছরের ২৪ নভেম্বর গ্যাস সংযোগ পেয়ে উৎপাদন শুরু হয়। তবে কখনো গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, কখনো প্রযুক্তিগত ত্রুটিতে উৎপাদন থেমে থাকে। এবার নতুন করে যুক্ত হলো ইঁদুরের উপদ্রব।

গণঅধিকার পরিষদ সরিষাবাড়ী উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আল-আমিন মিলু বলেন, ‘হাজার হাজার কোটি টাকার কারখানা একটা ইঁদুরের কামড়ে বন্ধ হয়ে গেলে সেটা শুধু দুর্ভাগ্য নয়, এটা অব্যবস্থাপনার লক্ষণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘বড় শিল্প স্থাপনায় রডেন্ট কন্ট্রোল একটি নিয়মিত প্রটোকলের অংশ। পাওয়ার প্ল্যান্ট, ক্যাবল ট্রে ও কন্ট্রোল রুমের মতো স্পর্শকাতর স্থানে তার ও যন্ত্রপাতি সুরক্ষায় বিশেষ কভার, সিলিং এবং নিয়মিত পরিদর্শন বাধ্যতামূলক।’

আরও পড়ুন

যমুনা সার কারখানার বিদ্যুৎকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করা এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ইঁদুরের কারণে তার কেটে যাওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আছে। কিন্তু বড় শিল্প কারখানায় সাধারণত কেবলগুলো সুরক্ষিত ট্রেতে থাকে, প্রবেশপথগুলো সিল করা থাকে। নিয়মিত পেস্ট কন্ট্রোল করা হয়। এসব ব্যবস্থা ঠিকমতো থাকলে পুরো প্ল্যান্ট ব্ল্যাকআউট হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।’

তিনি বলেন, ‘একটি ইঁদুর ঢুকে তার কাটল আর পুরো প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে গেল, এটা বোঝায় যে কোনো না কোনো স্তরে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় ঘাটতি ছিল।’

যমুনা সার কারখানার কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেন, ‘রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে চাপ ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ, যন্ত্রপাতি আধুনিকীকরণ ও প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি থাকলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে।’

বিদ্যুৎ বিভাগের একজন সাবেক প্রকৌশলী বলেন, ‘পাওয়ার প্ল্যান্টের মতো জায়গায় ক্যাবল সুরক্ষা ও রডেন্ট কন্ট্রোল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো নিয়মিত না করলে ছোট একটি ত্রুটি বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।’

কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, দ্রুত মেরামত কাজ চলছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কারখানার জিএম অপারেশন মো. ফজলুল হক বলেন, ‘ঘটনাটি দুঃখজনক। আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছি। কোথায় ঘাটতি ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

শিল্প নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ইঁদুরের কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া যতটা ঘটনাচক্র, ততটাই একটি সতর্কবার্তা। বড় শিল্প স্থাপনায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শুধু বড় দুর্ঘটনা ঠেকানোর জন্য নয়; ছোট ত্রুটির চেইন প্রতিক্রিয়া ঠেকাতেও কার্যকর ব্যবস্থা দরকার।

এ ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে গ্যাস সংকট, উৎপাদন ঘাটতি ও কৃষকের সার–নির্ভরতা রয়েছে, সেখানে শিল্প অবকাঠামো কতটা সুরক্ষিত?

একটি ইঁদুরের কামড়ে যদি পুরো কারখানা অচল হয়ে যায়, তবে বড় প্রযুক্তিগত ঝুঁকি বা নাশকতার পরিস্থিতিতে প্রস্তুতি কতটা—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad