গত ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর আশা করা হয়েছিল–মাসের পর মাস চলা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন বিনিয়োগ শুরু হবে। কিন্তু সেই আশা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি টানা কয়েক মাস ধরে রেকর্ড পরিমাণ কমছে। গত সেপ্টেম্বরে এই প্রবৃদ্ধির হার নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে, যেখানে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ।
এই চিত্র থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, ব্যবসায়ীরা এখন নতুন করে ঋণ নিতে বা ব্যবসা বাড়াতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৮ শতাংশ ধরেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু বাস্তবে টানা সাত মাস ধরে এই হার ৫ শতাংশের নিচে পড়ে আছে। এর পেছনে রয়েছে চড়া সুদের হার, বাজারে পণ্যের কম চাহিদা, ব্যাংক খাতের নানা সমস্যা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ভয়।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, ‘সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা এখন নতুন বিনিয়োগ করলে আদৌ লাভ আসবে কি না সেই হিসাব মেলাতে পারছেন না।’
সরকার পরিবর্তনের পর ব্যবসায়ীদের মনে যে আত্মবিশ্বাস ফেরার কথা ছিল, তা এখনো দেখা যাচ্ছে না। দেশের ব্যবসায়ীরা যেমন খুব দেখে-শুনে পা ফেলছেন, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগও কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ শতাংশ কমেছে। গত বছরের এই সময়ে যেখানে ১১০ কোটি ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল, এবার তা নেমে এসেছে প্রায় ৭৯ কোটি ৫০ লাখ ডলারে। অথচ ২০২৫ সাল জুড়ে বিনিয়োগের অবস্থা বেশ ভালো ছিল।
রিজওয়ান রহমান জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় অনির্বাচিত সরকারের অধীনে বিদেশি ব্যবসায়ীরা নতুন করে বিনিয়োগের সাহস পাননি। পরে নির্বাচিত সরকার এলেও পরিস্থিতির বিশেষ কোনো উন্নতি হয়নি। সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতার অভাব এবং বিনিয়োগকারীদের ভরসা দিতে না পারা এখনো ব্যবসার সিদ্ধান্তে বড় বাধা হয়ে আছে। এর ওপর সম্প্রতি পোশাক খাতের কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ভুল বার্তা দিয়েছে। সময়মতো গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে এসব ঝামেলা সহজেই এড়ানো যেত।
একইভাবে দেশীয় ব্যবসায়ীরাও হাতগুটিয়ে বসে আছেন। রিজওয়ান রহমানের মতে, ‘বিনিয়োগকারীদের ভরসা ফেরাতে হলে আগে আইনের শাসন ও ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সরকার যদি এই মৌলিক বিষয়গুলোই দিতে না পারে, তবে ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে নতুন ব্যবসা শুরু করার তো কোনো অর্থ হয় না।’
ব্যাংকের চড়া সুদের কারণে ব্যবসা বাড়ানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। গত ৩১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের নীতি সুদের হার (পলিসি রেট) ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখনো ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে।
একদিকে বিক্রি কম, অন্যদিকে ব্যবসা চালানোর খরচ বেশি–এমন অবস্থায় এত চড়া সুদে ঋণ নিয়ে নতুন কারখানা খোলা বা ব্যবসা বাড়ানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া টানা মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের কেনার ক্ষমতা কমে গেছে। তাই নতুন করে পণ্য তৈরি করলে তা বিক্রি হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় আছে কোম্পানিগুলো।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি এভাবে টানা কমতে থাকা চিন্তার বিষয়। সুদের উচ্চ হার, বাজারে মন্দা ভাব, অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ও জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা খুব সাবধানে পা ফেলছেন। অনেকে নতুন কোনো ঝুঁকি না নিয়ে বর্তমান ব্যবসা বাঁচিয়ে রাখা আর পুরোনো ঋণ শোধ করাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ব্যাংকে টাকা থাকলেই যে বিনিয়োগ হবে–এমন নয়। ব্যবসায়ীরা যতক্ষণ বাজারে পণ্যের চাহিদা ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ দেখবেন না, ততক্ষণ তারা টাকা ঢালবেন না।
বিনিয়োগ ফেরাতে হলে ধারাবাহিক নীতি, উন্নত অবকাঠামো ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ দেওয়া জরুরি বলে জানান ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, সরকারকে ব্যবসা করার খরচ ও অনিশ্চয়তা কমাতে হবে। পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও রপ্তানি বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। আর ব্যাংকগুলোকেও ভালো ও সক্ষম ব্যবসা দেখে ঋণ দিতে হবে। কারণ বিনিয়োগ না হলে নতুন কর্মসংস্থান হবে না, যা দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় খারাপ প্রভাব ফেলবে।
যেসব ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করতে চান, তারাও ব্যাংকিং খাতের পুরোনো অনিয়ম ও খেলাপি ঋণের পাহাড় দেখে বিপদে পড়ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত বা খারাপ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশ।
খেলাপি ঋণের এই বোঝা ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা দুর্বল করে দিচ্ছে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। মূলধন সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো এখন কাউকে ঋণ দিতে গেলেই দশবার ভাবছে, ফলে ভালো কাজের জন্যও টাকা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশের কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী এখন চরম কষ্টে আছে এবং তারা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ঋণের চাহিদাও কমে গেছে। আগের সরকারের আমলের নানা অনিয়ম পুরো ব্যাংক খাতকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। এর ফলে একটা খারাপ চক্র তৈরি হয়েছে–ব্যবসায়ীরা নতুন করে ব্যবসা বাড়াতে ভয় পাচ্ছেন, আবার খেলাপি ঋণে জর্জরিত ব্যাংকগুলোর কাছেও ভালো ব্যবসায়ীদের দেওয়ার মতো যথেষ্ট টাকা নেই।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের ভয়াবহ সংকট। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বাধাগ্রস্ত হলে উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং পরিচালন খরচ বেড়ে যায়। ফলে নতুন প্রকল্প থেকে কত লাভ আসবে, তার হিসাব মেলানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, বিশ্ববাজারের মন্দা এবং দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে কেউ নতুন কারখানা খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
সবশেষে, সরকারের ব্যাংক থেকে দেদারসে ঋণ নেওয়াও নতুন সমস্যা তৈরি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রমতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই সরকার ব্যাংক থেকে নিট ৪৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা তাদের সারা বছরের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪৩ শতাংশ। সরকার এভাবে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিলে সাধারণ ও বেসরকারি ব্যবসার জন্য ঋণের সুযোগ আরও কমে যাবে।
মূলত, ঋণের প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্নে নেমে যাওয়া কেবল ব্যাংকের টাকা থাকার বা না থাকার বিষয় নয়, এটি ব্যবসায়ী সমাজের আস্থাহীনতারই বহিঃপ্রকাশ। বাজারে চাহিদা কম বলে ব্যবসা বাড়ানোর ইচ্ছা নেই, সুদের হার বেশি বলে ঋণ নেওয়া যাচ্ছে না, আর আইনশৃঙ্খলা ও জ্বালানি সংকটের কারণে ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ভালো ব্যবসায়ীদের ঋণ পাওয়া আটকে দিচ্ছে, আর সরকারের বেশি ঋণ নেওয়া সেই সংকটকে আরও বাড়াচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের আয়ে।
এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে শুধু ক্ষমতার বদলই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী জানান, সরকারকে অবিলম্বে আইনশৃঙ্খলা ভালো করতে হবে, গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হবে, বাজারদর নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। ব্যবসায়ীদের কেবল ঋণের সুবিধা দিলেই হবে না, তাদের মনে এই বিশ্বাস ফেরাতে হবে যে বিনিয়োগ করলে তা নিরাপদে টিকবে। নির্বাচন দেশের রাজনীতি হয়তো বদলেছে, কিন্তু বিনিয়োগকারীদের দূরে সরিয়ে রাখা অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো এখনো বদলাতে পারেনি।


