সকালে রান্না করতে গিয়ে গ্যাস পাননি বাড্ডার বাসিন্দা নাজমুল ইসলাম রিজওয়ান। শেষ পর্যন্ত বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হয়েছে তাকে। মিরপুরের বাসিন্দা ফরহাদ হোসেনেরও বুধবার সকাল থেকে চুলা জ্বলেনি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম ছিল যে রান্না করা যায়নি, কোথাও চুলা একেবারেই জ্বলেনি। বাধ্য হয়ে অনেকে বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করেছেন।
শুধু বাসাবাড়ি নয়, গ্যাসের সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছেন পরিবহন চালকেরাও। রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নিতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কোনো কোনো স্টেশন বন্ধ রাখতে হয়েছে, আর চালু থাকা স্টেশনগুলোতে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বুধবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রেও গ্যাস সরবরাহে টান পড়েছে।
মহেশখালীতে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ও বৃহস্পতিবার স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ অন্তত ৪০ কোটি ঘনফুট কম ছিল।
রাজধানীর আজিমপুর, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি সহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের স্বল্পচাপের খবর পাওয়া গেছে। একইভাবে মহাখালী, তেজগাঁও, মালিবাগ ও খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি স্টেশনেও গ্যাসের চাপ কম ছিল। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলেও আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার কাজে বিঘ্ন ঘটেছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, সামিটের টার্মিনালে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বুধবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হবে। এর প্রভাব পড়েছে আমদানি করা এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৮টায় জাতীয় গ্রিডে মোট সরবরাহ ছিল ২৫৪ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসে ১৫৬ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে ৯৭ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট।
তবে একই দিন দুপুর ২টায় মোট সরবরাহ কমে ২১১ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। বৃহস্পতিবারের সরবরাহের চিত্রও একই রকম ছিলো। এ সময় দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও এলএনজি থেকে সরবরাহ কমে দাঁড়ায় ৫৪ কোটি ঘনফুটে।
দেশে আমদানি করা এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট পরিচালিত টার্মিনালের দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট। সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট। ফলে একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকলে এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহের বড় একটি অংশ কমে যায়।
এমনিতেই দেশে গ্যাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। সরকারি হিসাবে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত চাহিদা ৫০০ থেকে ৫৫০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ থাকে ২৫০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। ফলে আমদানি সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও বিদ্যমান সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
শনিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত সামিটের টার্মিনাল বন্ধ থাকার কথা রয়েছে। শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় এসময় গ্যাসের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় সরবরাহের ঘাটতি থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদেররান্নার ভোগান্তিও অব্যাহত থাকতে পারে।
এর আগে গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেটের ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট কমে গিয়েছিল। ২৪ জুলাই সরবরাহ নেমে আসে ২১৭ কোটি ঘনফুটে। এতে বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়। পরবর্তী সময়ে সামিটের টার্মিনাল থেকেও সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক সরবরাহ আরও কমে প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছিল।


