বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের (বিওপি) সার্বিক স্থিতিতে ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে। তবে একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৩৪ শতাংশ বেড়ে ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৩ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। আমদানি বাড়লেও রপ্তানি কমায় ঘাটতি বড় হয়েছে।
রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক যে হিসাব প্রকাশ করেছে তাতে দেখা গেছে, গেল অর্থবছরে এর আগের বছরের তুলনায় বিওপি উদ্বৃত্ত প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
তবে বৈদেশিক লেনদেনের মূল দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে বাণিজ্যের হিসাবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিপরীতে রপ্তানি আয় দশমিক ২ শতাংশ কমে ৪৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
ফলে বাণিজ্য ঘাটতি আগের বছরের ২০ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এক বছরে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকেও দুর্বলতা ছিল। তৈরি পোশাক রপ্তানি ১ শতাংশ কমে ৩৮ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
বাণিজ্য ঘাটতির চাপ সামাল দেওয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল রেমিট্যান্স। অর্থবছরে প্রবাসী আয় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মোট বেসরকারি স্থানান্তর বেড়েছে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ, দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারে।
এর পরও চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়েছে। আগের অর্থবছরে এ ঘাটতি ছিল মাত্র ১৩৮ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে ১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে জুনে চাপ দ্রুত বেড়েছে। মে পর্যন্ত চলতি হিসাবের ঘাটতি ছিল ২৮১ মিলিয়ন ডলার। জুনের হিসাব যুক্ত হওয়ার পর তা ১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক মাসেই ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার।
একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতিও মে পর্যন্ত ২৩ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার থেকে অর্থবছর শেষে ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে উঠে যায়। জুনেই এ ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার।
বাণিজ্য ও চলতি হিসাবের এই চাপের মধ্যেও বিওপিকে উদ্বৃত্তে রেখেছে বড় অঙ্কের আর্থিক প্রবাহ। আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত আগের বছরের ৩ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তবে এই প্রবাহের বড় অংশ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ থেকে আসেনি। নিট এফডিআই ১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। বিপরীতে ‘অন্যান্য বিনিয়োগ’ বেড়ে ৬ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাণিজ্য ঋণের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। আগের অর্থবছরে এ খাতে ৩ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের নিট বহিঃপ্রবাহ ছিল। চলতি অর্থবছরে তা ঘুরে ৩ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারের নিট অন্তঃপ্রবাহে দাঁড়িয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক অর্থায়নে আবার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ছাড় ২০ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৭ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। একই সময়ে ঋণের আসল পরিশোধ ২০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। সরকারি বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধও বেড়ে ২ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
তবে রিজার্ভের সক্ষমতা শক্তিশালী হয়েছে। মোট সরকারি রিজার্ভ ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। পণ্য ও সেবা আমদানির হিসাবে রিজার্ভ দিয়ে ৫ দশমিক ৪ মাসের ব্যয় মেটানো সম্ভব, যা আগের বছর ছিল ৫ মাস। শুধু পণ্য আমদানির হিসাবে কভার বেড়ে ৬ মাস হয়েছে।


