বিশ্ব বাঘ দিবসে প্রাণহানির নানা উদ্বেগের মাঝেও সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার রক্ষায় মিলছে আশার খবর। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বনাঞ্চলে ধীরে ধীরে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা।
আজ বিশ্ব বাঘ দিবস। সুন্দরবনসংলগ্ন জেলার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে গত কয়েক বছর ধরে ঢাকার বাইরে জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ’।
বন বিভাগের তথ্যমতে, ২০১৫ সালের ক্যামেরাট্র্যাপিং জরিপে সুন্দরবনে বাঘ ছিল ১০৬টি। ২০১৮ সালে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১১৪টিতে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের অক্টোবরের জরিপে বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা পাওয়া যায় ১২৫টি। গত শুক্রবার আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র এলাকায় একটি বাঘ দেখা গেছে। ট্র্যাপ ক্যামেরার ছবি বিশ্লেষণে সেখানে আরও তিনটি বাঘ শনাক্ত হয়েছে। বন বিভাগের দাবি, আগের তুলনায় বাঘের লোকালয়ে আসার প্রবণতা ও মানব-বাঘ সংঘাত কমেছে।
তবে অস্তিত্বের ঝুঁকিও কম নয়। চোরাশিকারী চক্র, জলবায়ু পরিবর্তন, বনদস্যুদের তৎপরতা এবং পরিবেশগত চাপ বাঘের জন্য হুমকি তৈরি করছে। ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২৫ বছরে সুন্দরবনে ৬১টি বাঘ মারা গেছে। এর মধ্যে দুর্বৃত্তদের হাতে ২৬টি, লোকালয়ে জনতার হাতে ১৪টি, স্বাভাবিকভাবে ১৯টি এবং ঘূর্ণিঝড় সিডরসহ অন্যান্য কারণে দুটি মারা যায়। পূর্ব বিভাগে ৩০টি ও পশ্চিম বিভাগে ৩১টি বাঘের মৃত্যু হয়। একই সময়ে বাঘের আক্রমণে ১৩ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি ফাঁদে পড়া প্রায় ১০ বছর বয়সী একটি বাঘিনীকে উদ্ধার করে বন বিভাগ। চিকিৎসায় সুস্থ করার পর ১২ জুলাই তাকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বন রক্ষায় নিয়মিত অভিযান চলছে। বিগত এক বছরে বিপুল পরিমাণ ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে, ৭০ জন হরিণ শিকারিকে আটক করা হয়েছে। ১৫০ জন চোরাশিকারীর তালিকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দেওয়া হয়েছে। বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণের সংখ্যাও বেড়েছে।
পশ্চিম বন বিভাগের ডিএফও এ জেড এম ছানুর রহমান বলেন, বাঘসহ বনসম্পদ রক্ষায় বন বিভাগ সর্বদা সতর্ক রয়েছে। সুন্দরবনের দুবলার ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, বাঘিনীর নিরাপদ প্রজননের জন্য প্রজননস্থলগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি। বর্তমানে সুন্দরবনে বাঘের বিচরণ বেশি দেখা যাচ্ছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, চোরাশিকারী, বিষ প্রয়োগ ও বনদস্যুদের তৎপরতার কারণে বাঘ হুমকির মুখে রয়েছে। তবে গত ১২ বছরে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়াকে বড় অর্জন বলে উল্লেখ করেন তিনি। বনের ওপর মানুষের নির্ভরতা কমানো, বন বিভাগের সক্ষমতা বাড়ানো, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং নিয়মিত নদী-খাল খননের তাগিদ দেন এই বিশেষজ্ঞ।
এদিকে বিশ্ব বাঘ দিবসে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানায় এক অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, বাঘ পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের অপরিহার্য অংশ। প্রাণীটি সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে সংরক্ষণবিষয়ক মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রায় একশ বছর আগে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ। বর্তমানে তা কমে পাঁচ হাজারের মতো হয়েছে। সুন্দরবনে বর্তমানে ১২৪টি বাঘ রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানায় প্রায় ১৫টি এবং দেশের বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় প্রায় ৫০টি বাঘ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার বাঘ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে। বাঘ গণনার বাজেট ও স্বচ্ছতার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বাঘ গণনার বিষয়টি বন বিভাগের আওতাধীন এবং তারা নিজস্ব প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার সঙ্গে এ কার্যক্রম পরিচালনা করে।


