মুন্সিগঞ্জ জেলা কারাগারে কারারক্ষীদের হাতে মারধরের শিকার হওয়ার অভিযোগের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বন্দী সাবেক র্যাব কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মোহাম্মদকে কারাবিধি অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ দেয়। তবে এ ঘটনায় বিচারিক তদন্ত চেয়ে করা আবেদন যথাযথ প্রক্রিয়ায় না হওয়ায় তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে আসামিপক্ষ।
তারেক সাঈদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মাহমুদুল হুসাইন রুবেল। প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে মুন্সিগঞ্জ জেলা কারাগারে তারেক সাঈদকে কারারক্ষীরা লাঠিসোঁটা দিয়ে পিটিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তার আইনজীবী। শুনানিতে রুবেল বলেন, কয়েকজন কারারক্ষী অতর্কিত হামলা চালালে তারেক সাঈদ মাথায় আঘাত পান। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও তাকে ব্যাপকভাবে নির্যাতন করা হয়। কারাসুপারের নির্দেশে এ হামলা চালানো হয়েছিল বলে তারা জানতে পেরেছেন।
এ ঘটনায় তদন্তের পাশাপাশি তারেক সাঈদকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় অথবা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার আবেদন করেন তারা।
প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন শুনানিতে বলেন, নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলায় তারেক সাঈদ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এবং তাকে কনডেম সেলে রাখার কথা। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার কোনো অভিযুক্ত বা আসামি অসুস্থ হলে সাধারণত প্রসিকিউশন চিকিৎসার বিষয়ে আপত্তি জানায় না। মানবিক দিক বিবেচনায় এ সুবিধা দেওয়া হয়। তবে তারেক সাঈদকে দেখে অসুস্থ মনে হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় তারেক সাঈদের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হওয়ার বিষয়টি এবং তাকে কনডেম সেলে রাখার প্রসঙ্গ আবেদনে উল্লেখ করা হয়নি কেন, তা আসামিপক্ষের আইনজীবীর কাছে জানতে চায় ট্রাইব্যুনাল।
জবাবে রুবেল বলেন, তারেক সাঈদ দীর্ঘদিন ধরে কারাগারের সাধারণ ওয়ার্ডে রয়েছেন। মুন্সিগঞ্জ কারাগারে হামলার ঘটনার পর তাকে কোনো চিকিৎসাসনদ না দিয়েই কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। অথচ এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে পাঠানোর সময় চিকিৎসাসনদ দেওয়া হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে কারাবিধি অনুযায়ী তারেক সাঈদকে চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
বিচারিক তদন্ত চেয়ে আবেদন
মুন্সিগঞ্জ জেলা কারাগারে হামলা ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে সুষ্ঠু ও স্বাধীন বিচারিক তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে গত ২৭ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন তারেক সাঈদ। আবেদনে বলা হয়, ১৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে কারাগারে বন্দী অবস্থায় তার ওপর হামলা ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এ ঘটনার বিচারিক তদন্ত প্রয়োজন।
তবে বৃহস্পতিবার শুনানির সময় বিচারিক তদন্তের আবেদন যথাযথ প্রক্রিয়ায় করা হয়নি উল্লেখ করে তা প্রত্যাহার করে নেয় আসামিপক্ষ।
ফলে ট্রাইব্যুনালের এ দিনের আদেশে চিকিৎসার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হলেও বিচারিক তদন্তের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
হামলার পর কারাগারের ভেতরে উদ্ভূত পরিস্থিতি ও নিরাপত্তার স্বার্থে তারেক সাঈদকে মুন্সিগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয় বলে জানা গেছে।
গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত ১০ আগস্ট তারেক সাঈদকে গ্রেপ্তার দেখায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। প্রসিকিউশনের আবেদনের শুনানি শেষে এ আদেশ দেওয়া হয়।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুরের বিএনপি নেতা আব্দুল মান্নান, জহিরুল ইসলাম সুমন ও আসাদুজ্জামান বাবুলকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। একই ঘটনায় বিএনপি কর্মী বেল্লাল হোসেনকে গুম করার অভিযোগও আনা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর কুমিল্লার লাকসামের বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম হিরু ও হুমায়ুন কবির পারভেজকে গুম করার অভিযোগ রয়েছে। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, এসব ঘটনার সময় তারেক সাঈদ র্যাব-১১-এর অধিনায়ক (সিও) ছিলেন। এসব অভিযোগের তদন্ত চলছে।
সাত খুনের মামলায় মৃত্যুদণ্ড
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ ও পরে হত্যা করা হয়। ওই সময় নারায়ণগঞ্জে র্যাব-১১-এর অধিনায়ক ছিলেন তারেক সাঈদ মোহাম্মদ।
তদন্ত ও বিচারিক নথিতে ওই অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডে তারেক সাঈদের নির্দেশ ও সম্পৃক্ততার বিষয় উঠে আসে। ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জের একটি আদালত এ মামলায় তারেক সাঈদসহ একাধিক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। পরে হাইকোর্টেও তার মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন।


