কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানার পর অন্তত ১৩২ জন নিহত হয়েছেন এবং শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। কলম্বিয়ান জিওলজিক্যাল সার্ভিসের (এসজিসি) মতে, এই ভূমিকম্পটি চলতি শতাব্দীতে দেশটিতে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
সোমবারের ভূমিকম্পে পশ্চিম কলম্বিয়ার কালি, পেরেইরা, কুইবদো ও মানিজালেসসহ বিভিন্ন শহর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পার্শ্ববর্তী ইকুয়েডর ও পানামাতেও ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উপকেন্দ্র ছিল রাজধানী বোগোতা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার (২৫০ মাইল) পশ্চিমে, চোকো অঞ্চলের সান হোসে দেল পালমারে। ভূমিকম্পটি ভূপৃষ্ঠের ১০৭ কিলোমিটার (৬৬ মাইল) গভীরে আঘাত হানে।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ২১টি পরাঘাত বা আফটারশক অনুভূত হয়।
দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালিতে উদ্ধারকারী দল ও সাধারণ মানুষ ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনগুলোর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজতে থাকেন। বড় বড় কংক্রিটের টুকরো ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ স্বেচ্ছাসেবকদের দীর্ঘ মানবশৃঙ্খলের মাধ্যমে একে অপরের কাছে পৌঁছে সরানো হচ্ছিল। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অন্তত ২০টি ভবন ধসে পড়েছে এবং ৩৮০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বহু মানুষ আটকা পড়েছেন।
কালির ৬৪ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক হোর্হে মোনকায়ো এপিকে বলেন, ভবনগুলো ধসে পড়ার সময় তিনি পুরো শহরজুড়ে ধুলোর মেঘ উঠতে দেখেছেন।
‘আমার পুরো বাড়ি কেঁপে উঠেছিল। আমি জীবনে কখনো এত শক্তিশালী ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা পাইনি। আমরা বেঁচে আছি এজন্য স্রষ্টাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি।’
হুয়ান কার্লোস ওসোরিও কারাকোল টেলিভিশনকে বলেন, কালিতে ধসে পড়া একটি ভবন থেকে ধ্বংসাবশেষ সরানোর সময় সেটি ধসে পড়ার শব্দ ‘বোমার বিস্ফোরণের মতো’ শোনায়।
‘আমরা সব প্রতিবেশী একসঙ্গে কাজ করছি, মানবশৃঙ্খল তৈরি করে। আমাদের ভারী সরঞ্জাম দরকার। অনেক মানুষ আটকা পড়েছেন।’
জরুরি অবস্থা
৪৮ বছর বয়সী আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার মাত্র কয়েক দিন পর এই ভূমিকম্প আঘাত হানে। ফলে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রথম বড় সংকটের মুখে পড়ে। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই পার্শ্ববর্তী ভেনেজুয়েলায় জুন মাসে দুটি বিধ্বংসী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল–সেই স্মৃতিও তখনও তাজা।
স্থানীয় সময় দুপুর প্রায় ১টার দিকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে তিনি বলেন, ‘জাতীয় সরকার জীবন রক্ষা করতে, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করতে এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে ত্রাণ পৌঁছে দিতে তার সব সক্ষমতা কাজে লাগিয়েছে।’
‘ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করাই প্রথম অগ্রাধিকার।’
দে লা এসপ্রিয়েলা বলেন, প্রাথমিক প্রতিবেদনে ১১১ জন নিহত ও ৮৭ জন আহত হওয়ার কথা জানা গেছে। এ ছাড়া কয়েক ডজন ভবন ধসে পড়েছে এবং বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গবেষণা সংস্থা কলম্বিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যাপিটাল সিটিজ জানিয়েছে, অন্তত ১৩২ জন নিহত এবং আরও ৫৭০ জন আহত হয়েছেন।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কলম্বিয়ার কফি উৎপাদনকারী অঞ্চলের অংশ রিসারালদা অঞ্চলে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। অঞ্চলটির রাজধানী পেরেইরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সেখানে উদ্ধারকর্মীরা ধসে পড়া ভবনগুলোতে জীবিতদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন।
ক্যালি যে ভায়ে দেল কাউকা অঞ্চলে অবস্থিত, সেখানে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিনটি শিশুও রয়েছে।
ভূমিকম্পটির উপকেন্দ্রের কাছাকাছি চোকো অঞ্চল থেকে খবর পেতে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দেরি হচ্ছে। ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টা পরও কিছু এলাকায় মোবাইল ফোন পরিষেবা চালু হয়নি। গভর্নর নুবিয়া ক্যারোলিনা কর্দোবা জানান, মূলত গ্রামীণ এই এলাকায় ১২ জন নিহত এবং ৮৪ জন আহত হয়েছেন।
এই অঞ্চলের রাজধানী কুইবদোর কমিউনিটি নেতা লুইস গ্রেগোরিও মোরেনো সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেন, অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবাই বিধ্বস্ত। এই মুহূর্তে মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে, কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন, কিন্তু সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় যারা রয়েছেন, তারা হলেন নিখোঁজ মানুষ।’
শত শত মানুষ নিখোঁজ
সোমবার বিকালের মধ্যে মানুষজন ডিজিটাল ডেটাবেসে তাদের নিখোঁজ স্বজনদের নাম নথিভুক্ত করতে শুরু করেন। এর মধ্যে একটি ডেটাবেসে ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষের নাম ছিল, যাদের বেশিরভাগই কালি ও পেরেইরার বাসিন্দা। সময়ের সঙ্গে এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছিল।
পেরেইরায় স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, বিমানবন্দরের ছাদের কিছু অংশ যাত্রীদের ওপর ভেঙে পড়ছে। যাত্রীরা তখন আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন এবং আতঙ্কে চিৎকার করছিলেন। ভিডিওতে একটি চারতলা ভবন ধসে পড়তেও দেখা যায়।
পেরেইরার মেয়র মরিসিও সালাজার স্থানীয় একটি রেডিও স্টেশনকে বলেন, অন্তত ১৫টি ভবন ধসে পড়েছে এবং এসব ভবনের ভেতরে মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কাছের মানিজালেসে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, শহরের ঐতিহাসিক নিও-গথিক ক্যাথেড্রালের পাশের একটি টাওয়ার ধসে পড়ে এবং ধ্বংসাবশেষ আশপাশের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কয়েকটি বিমানবন্দরে কার্যক্রম স্থগিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পেরেইরা, মানিজালেস, কুইবদো, আরমেনিয়া, কার্তাগো ও বুয়েনাভেন্তুরা। প্রকৌশলীরা এসব স্থাপনার কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা করছিলেন।
ভূমিকম্পপ্রবণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত কলম্বিয়ায় কম মাত্রার ভূমিকম্প সাধারণ ঘটনা। তবে ৬ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প বিরল। ১৯৯৯ সালে আরমেনিয়া শহরের কাছে ৬ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে ১ হাজার ১০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
কলম্বিয়ান জিওলজিক্যাল সার্ভিস সোমবারের ভূমিকম্পটিকে ২১শ শতকে দেশটিতে রেকর্ড হওয়া ‘সবচেয়ে শক্তিশালী’ ভূমিকম্প বলে উল্লেখ করেছে।
নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ভূকম্পবিদ সুজান ভ্যান ডার লি বলেন, ভূমিকম্পটির মাত্রা, দেশের অভ্যন্তরে এর অবস্থান এবং ভূমিকম্পের সময় ভূত্বকের দুটি অংশের অনুভূমিকভাবে একে অপরের পাশ দিয়ে সরে যাওয়ার ধরন–যাকে স্ট্রাইক-স্লিপ মুভমেন্ট বলা হয়–জনবসতিপূর্ণ উপত্যকাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল যথেষ্ট বেশি।
তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘এটি ভূত্বকের অনেক নিচে ঘটেছে এবং তাত্ত্বিকভাবে এর কারণে এতটা কম্পন হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এই মাত্রার ভূমিকম্পে বাস্তবে প্রচুর কম্পন হয়েছে।’
বিভিন্ন দেশের সহায়তার প্রতিশ্রুতি
সোমবার রাতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জরুরি আশ্রয়, খাদ্য এবং ভূমিকম্প-পরবর্তী অন্যান্য সহায়তার জন্য তারা ১৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার দেবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক্সে লেখেন, ‘কলম্বিয়ায় আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পটি আমরা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছি এবং কলম্বিয়ার জনগণকে সহায়তা করতে প্রস্তুত আছি।’
লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশও কলম্বিয়াকে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসে।
এল সালভাদোরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে এবং মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম–যাদের দেশ সাম্প্রতিক সংকটের পর ভেনেজুয়েলাকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে ছিল–কলম্বিয়াকে সাহায্যের প্রস্তাব দেন।
বুকেলে বলেন, ‘এল সালভাদোর থেকে আমরা যোগাযোগ রাখছি এবং আমাদের উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসাকর্মী, প্যারামেডিক, সরঞ্জাম কিংবা আমাদের কলম্বিয়ান ভাই-বোনেরা যেকোনো ধরনের সহায়তা প্রয়োজন মনে করলে তাৎক্ষণিকভাবে তা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি।’
প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্ত বলেন, এই অঞ্চলের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ চিলি ‘ভূমিকম্পের রেখে যাওয়া যন্ত্রণা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানে’ এবং তিনি কলম্বিয়াকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন।
ইসরায়েল, ইকুয়েডর ও ফ্রান্সও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।


