উত্তর আরাকানে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সহিংসতার অভিযোগ নিয়ে প্রকাশিত ইউনাইটেড লীগ অব আরাকানের (ইউএলএ) প্রতিবেদনকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বানোয়াট’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিল (এআরএনসি)।
এক বিবৃতিতে এআরএনসি অভিযোগ করে, ইউএলএর প্রতিবেদনটি রোহিঙ্গাবিরোধী বয়ান প্রতিষ্ঠার জন্য বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।
‘উত্তর আরাকানে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে সহিংসতা: একটি বিশ্লেষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ইসলামি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, ধর্মীয় আধিপত্য, একচেটিয়া মুসলিম অঞ্চল ও খিলাফত–এর মতো উসকানিমূলক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করে এআরএনসি। সংগঠনটির মতে, এসব শব্দচয়ন রোহিঙ্গা পরিচয় ও মুসলিম ধর্মবিশ্বাসকে ভুলভাবে সশস্ত্র উগ্রবাদের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এআরএনসি বলেছে, তারা রোহিঙ্গা, রাখাইন, হিন্দু, ম্রো, খুমি, দাইংনেট, থেট, মারামাগি—সব সম্প্রদায়ের বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার নিন্দা জানায়। তবে মানবাধিকারের ধারণা ব্যবহার করে পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
সংগঠনটির দাবি, প্রতিবেদনে আরাকানের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে মূলত ঔপনিবেশিক আমলে চট্টগ্রাম থেকে অভিবাসনের ফল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যা ইতিহাসভিত্তিক বিশ্লেষণ নয়; বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বৈষম্যমূলক বক্তব্য।
এআরএনসি জোর দিয়ে বলেছে, রোহিঙ্গারা বিদেশি, অতিথি বা ঔপনিবেশিক অনুপ্রবেশকারী নয়; তারা আরাকানের অবিচ্ছেদ্য আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যাদের গভীর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও ধর্মীয় শিকড় রয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গবেষণাতে ১৭৯৯ সালে ইতিহাসবিদ ফ্রান্সিস বুকানান-হ্যামিল্টনের বর্ণনায় “রুইঙ্গা” নামে আরাকানের মুসলিম জনগোষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যা আধুনিক রোহিঙ্গা পরিচয় বিতর্কের বহু আগের ঘটনা।
এআরএনসি জানিয়েছে, তারা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর বেআইনি হত্যা, অপহরণ বা নির্যাতনের পক্ষে নয়। যেকোনো বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচার হওয়া উচিত। তবে ইউএলএর প্রতিবেদনকে তারা স্বাধীন তদন্ত নয়, বরং রোহিঙ্গাসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগকে আলাদা করে তুলে ধরা এবং আরাকান আর্মি/ইউএলএর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতার অভিযোগকে আড়াল করার প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
সংগঠনটির অভিযোগ, প্রতিবেদনে আরাকান আর্মির হাতে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, অঙ্গহানি ও ভয়ভীতি তৈরির ঘটনাগুলোর উল্লেখ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
এআরএনসি আরও বলেছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সন্ত্রাসবাদকে যুক্ত করার যেকোনো প্রচেষ্টা তারা প্রত্যাখ্যান করে। তাদের ভাষ্য, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী পুরো রোহিঙ্গা জাতির প্রতিনিধিত্ব করে না। অধিকাংশ রোহিঙ্গাই কৃষক, জেলে, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বাস্তুচ্যুত সাধারণ মানুষ; যারা গণহত্যা, রাষ্ট্রহীনতা ও দীর্ঘমেয়াদি নিপীড়নের শিকার।
সংগঠনটি উত্তর আরাকানে বেসামরিক হত্যাকাণ্ড, গুম, গ্রাম পোড়ানো, জোরপূর্বক নিয়োগ, যৌন সহিংসতা, ভূমি দখল ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছে।
একই সঙ্গে ২০১৬–২০১৭ সালের রোহিঙ্গা গণহত্যার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানিয়ে এআরএনসি বলেছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, উগ্রপন্থী নেটওয়ার্ক ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা উচিত।
সবশেষে সংগঠনটি রোহিঙ্গাসহ আরাকানের সব জাতিগোষ্ঠীর বেসামরিক নাগরিকদের তাৎক্ষণিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।


