চলতি মাসের শেষ দিকে ঢাকায় আসছেন ইসলামী বক্তা জাকির নায়েক। ভারতের প্রত্যাশা, দেশটির ওয়ান্টেড এই আসামির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ। দেশটির পক্ষ থেকে সেই আহ্বানও জানানো হয়েছে। আর ভারতের এই অবস্থান বাংলাদেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা আর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন যে, জাকির নায়েককে নয়াদিল্লির হাতে তুলে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে প্রস্তাব দেবে কিনা?
জবাবে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘তিনি (জাকির নায়েক) একজন পলাতক। তিনি ভারতে ওয়ান্টেড। সুতরাং, আমরা আশা করি তিনি যেখানেই যান, সেখানকার কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে এবং আমাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলো আমলে নেবে।’
আপাতদৃষ্টিতে জয়সওয়ালের এই সাধারণ মন্তব্য বাংলাদেশে ঝড় তুলেছে। এমন এক সময়ে এই বক্তব্য এল যখন খোদ ভারতের বিরুদ্ধেই বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যিনি এখন নিজের দেশেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত। ফলে ভারতের এই বৈসাদৃশ্যমূলক অবস্থান কারও চোখ এড়ায়নি।
এক পলাতকের জন্য আশ্রয়, অন্যের জন্য চাপ
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুমসহ মানবতাবিরোধী নানা অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। জাতিসংঘের একটি তথ্যানুসন্ধানী মিশন আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর সরকারের দমনপীড়নের কারণে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মৃত্যুর ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে।
দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকার পরেও শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য ফেরত পাঠাতে গত বছরের ডিসেম্বরে ঢাকার পাঠানো আনুষ্ঠানিক অনুরোধে সাড়া দেয়নি ভারত। এমনকি এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপও নেয়নি।
অথচ নয়াদিল্লি এখন আশা করছে যে, অর্থ পাচার এবং কথিত বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের অভিযোগে অভিযুক্ত একজন ভারতীয় নাগরিক জাকির নায়েক বাংলাদেশে পা রাখলে ঢাকা দ্রুত তাদের সহযোগিতা করবে। অনেক বাংলাদেশির কাছেই এই দ্বিচারিতাকে ভণ্ডামি বলে মনে হচ্ছে।
শুধু বাংলাদেশিরাই নন। বিদেশী কূটনীতিকরাও এই বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে এবং প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন।
ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিজ তার এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। ভারত কি সত্যিই একজন পলাতককে ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সহযোগিতা আশা করছে, যখন তারা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অসংখ্য পলাতক সদস্যের জন্য লাল গালিচা বিছিয়ে রেখেছে?’
কে এই জাকির নায়েক?
৬০ বছর বয়সী এই ইসলামী বক্তা ২০০০-এর দশকে তার টিভি চ্যানেল ‘পিস টিভি’র মাধ্যমে খ্যাতি অর্জন করেন। ওই টেলিভিশনে মুসলিম বিশ্বজুড়ে তার বক্তৃতা সম্প্রচার করা হতো। সমালোচকরা বলেন, জাকির নায়েক অসহিষ্ণুতা প্রচার করেন। তবে সমর্থকরা মনে করেন, তিনি পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গীর বিরুদ্ধে ইসলামের রক্ষক হিসেবে কাজ করেন।
২০১৬ সালে ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার পিস টিভি নিষিদ্ধ করে। জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা করে এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানোর অভিযোগ করে।
গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি মালয়েশিয়ায় চলে যান, সেখানে তাকে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতিও দেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি ভারতে ফিরতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন এবং বলেছেন যে তিনি কেবল তখনই ফিরবেন ‘যখন ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেওয়া হবে।’
পরিহাসের বিষয় হলো, ঢাকায় হলি আর্টিজান হামলায় জড়িত অন্তত দুইজন জঙ্গি জাকির নায়েকের বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়েছিল বলে খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল বাংলাদেশ সরকার। সেই সময় ক্ষমতায় ছিলেন শেখ হাসিনা, যিনি নয়াদিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জন্য পরিচিত ছিলেন।
এখন শেখ হাসিনার সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে, সেই নিষেধাজ্ঞাটি নীরবেই বাতিল হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে জাকির নায়েকের সম্ভাব্য সফর নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ফের আলোচনায় এসেছে।
ঢাকায় জনরোষ
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন বাংলাদেশিরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় এমন অনেক পোস্ট চোখে পড়ছে যেখাানে ভারতের আচরণকে ‘ঔপনিবেশিক মনোভাব’ এবং ‘খণ্ডিত নৈতিকতা’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে। দেশটির বক্তব্যের নিন্দাও জানানো হচ্ছে।
ভারত কখনোই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ হাতছাড়া করে না। কিন্তু যখন ঢাকা গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত কারও জবাবদিহিতা চায়, তখন নয়াদিল্লি মুখ ফিরিয়ে নেয়।
অসম অংশীদারত্ব
বছরের পর বছর ধরে ভারতের সঙ্গে অসম সম্পর্কে রয়েছে বাংলাদেশ। ভারতে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে আচরণ বা বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি ঢাকা। কিন্তু ভারতীয় কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় যেমন-নির্বাচনের স্বচ্ছতা থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা পর্যন্ত সবকিছুতেই মতামত দেন।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় কূটনীতিকরা বিভিন্ন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন, স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে দেখা করেন এবং এমনকি প্রকাশ্য বিবৃতিও দেন। তাদের জন্য এসব কাজ স্বাভাবিক হলেও ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশি কূটনীতিকদের জন্য তা অচিন্তনীয়।
এই দৃশ্যমান ভারসাম্যহীনতা বাংলাদেশের মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের ‘বড় ভাই’ সুলভ মনোভাব দিল্লিপন্থী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সহনীয় থাকলেও শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে বেমানান। বিশেষ করে তখন যখন দেশের মানুষের মধ্যে নতুন করে জাতীয়তাবাদী চেতনার উত্থান ঘটেছে।
পারস্পরিকতা, অথবা তার অভাব
কূটনীতি পারস্পরিকতার ওপর গড়ে ওঠে। কিন্তু জাকির নায়েক-শেখ হাসিনা ইস্যুটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কতটা একতরফা হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ছোট প্রতিবেশী হওয়ার পরেও ভারতের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক উদ্বেগগুলো পূরণ করে গেছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহীদের দমন করা থেকে শুরু করে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়া পর্যন্ত কাজ করেছে, যার জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও সরকারকে সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে।
যদিও বিনিময়ে পানি বন্টন, সীমান্ত হত্যা এবং বর্তমানে পলাতকদের প্রত্যর্পণ বিষয়ে ঢাকার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত অনুরোধগুলো ঝুলে আছে।
ফলে সম্পর্কটি সবসময়ই ভারতের দিকে ভারী ছিল। সমস্যা শুধু রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধার গভীর অভাব।
সামনের পথ
নয়াদিল্লির জন্য শেখ হাসিনাকে আশ্রয়ে রেখে জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঢাকাকে চাপ দেওয়া সেই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠিত করে যে ভারত অহংকারী দেশ। সেই সঙ্গে তার নৈতিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সেই সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এই অঞ্চলে ভারতের ‘সফট পাওয়ার’ কিছুটা ক্ষয়ে আসারও ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী। তারা এমন কোনো দাবি মেনে চলতে চায় না যা অন্যায্য।
ভারত যদি সত্যিই একটি স্থিতিশীল এবং পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারত্ব চায়, তবে তাকে বাংলাদেশকে একটি ‘নিরর্ভরশীল রাষ্ট্র’ হিসেবে নয় বরং একজন সমান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। চাপ নয় সম্মানই হলো সেই ‘মাধ্যম’ যা এই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখবে।
অন্যথায়, দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার বিশেষ সম্পর্কের অবনতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে ঢাকা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তারা বলছেন, যদি সম্পর্কের অবনতি হতেই থাবে তাহলে এবার বাংলাদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশটি হবে না।


